ডিমলায় ২২ প্রতিবন্ধীর মুখে হাসি: জেলা প্রশাসকের মানবিক সহায়তায় পাল্টে যাচ্ছে জীবন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দোহলপাড়া গ্রামের সাবিহা বেগম। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁর জীবনটা থমকে গিয়েছিল চার দেয়ালের মাঝে। অন্যের সাহায্য ছাড়া এক পা নড়াচড়া করার উপায় ছিল না তাঁর। সংসারের টানাটানির সংসারে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে একটি হুইলচেয়ার কেনা ছিল তাঁর কাছে আকাশকুসুম স্বপ্ন। কিন্তু অবশেষে নীলফামারী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেই স্বপ্ন পূরণ হলো। একটি হুইলচেয়ার হাতে পেয়ে আবেগে আপ্লুত সাবিহা অশ্রুসিক্ত চোখে বললেন, “আল্লাহ ওনার ভালো করুক। এই চেয়ারখান পেয়ে এখন ভালোভাবে চলতে পারব। অনেক দিনের কষ্ট দূর হবে।” সাবিহার মতো এমন ২২ জন প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে মঙ্গলবার এক নতুন আশার আলো ফুটেছে।

ডিমলা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নীলফামারীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান। তিনি নিজ হাতে ২২ জন শারীরিক প্রতিবন্ধীর মাঝে হুইলচেয়ার তুলে দেন। শুধু হুইলচেয়ার নয়, এদিন ৯ জন দুস্থ মানুষের মাঝে নগদ অনুদানের চেক এবং ১১ জন অসহায় ও দক্ষ নারীর মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। স্থানীয়দের মতে, একটি সেলাই মেশিন পেয়ে একটি পরিবারের আয় অন্তত ৫০% থেকে ৬০% বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ছোট ছোট সহায়তাগুলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি জানান, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ১০০% স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত অভাবীদের তালিকা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, সঠিক সুযোগ পেলে তারাও সম্পদে পরিণত হতে পারে। আমরা চেষ্টা করছি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে যাতে তারা সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।” প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগকে স্থানীয়রা সাধুবাদ জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের সাথে ডিমলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না, সহকারী কমিশনার (ভূমি) রওশন কবির এবং জেলা বিএনপির উপদেষ্টা অধ্যাপক রইসুল আলম চৌধুরী। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডিমলা উপজেলা আমির মাওলানা মজিবুর রহমান এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এই সমন্বিত উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে একটি সর্বজনীন রূপ দান করে। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই ধরনের কর্মসূচিতে দলমত নির্বিশেষে সবাই অংশ নিলে উন্নয়নের গতি আরও বাড়বে।

হুইলচেয়ার বিতরণের আগে ও পরে জেলা প্রশাসক মহোদয় ডিমলার বিভিন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। প্রথমে তিনি ডিমলা সদর ইউনিয়নের রামডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। সেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুলব্যাগ, বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। বর্তমান সময়ে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতে তিনি স্কুল প্রাঙ্গণে একটি জলপাই গাছের চারা রোপণ করেন। শিক্ষার্থীদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে তিনি তাদের পড়ালেখার খোঁজখবর নেন। স্কুলের শিক্ষকরা জানান, এই ধরনের সরকারি সফর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ১০০% বেশি উৎসাহ জোগায়।

এরপর জেলা প্রশাসক মাঝিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করেন। সেখানে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে তিনি রোগীদের সাথে সরাসরি কথা বলেন। ক্লিনিকের স্টকে থাকা ওষুধের তালিকা পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রী দ্রুত সরবরাহের নির্দেশ দেন। পরিদর্শন শেষে তিনি কুটিপাড়া গ্রামে উত্তম কৃষি চর্চা (জিএপি) অনুসরণকৃত একটি প্রদর্শনী প্লট দেখতে যান। কৃষকদের সাথে কথা বলে তিনি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, কৃষিতে বিষমুক্ত খাবার উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারলে দেশের জনস্বাস্থ্য অন্তত ৪০% উন্নত হবে।

দিনের শেষ কর্মসূচিতে তিনি ডিমলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। সেখানে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে ক্রিকেট ব্যাট, বল, ভলিবল ও ফুটবল বিতরণ করেন। বিশেষ করে ছাত্রীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে তিনি স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেন, যা একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এছাড়া বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মান উন্নয়নে তিনি উঁচু-নিচু বেঞ্চ প্রদান করেন এবং ভবিষ্যতে ডিজিটাল স্ক্রিন বা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। স্কুলের শিক্ষার্থীরা এমন উপহার পেয়ে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়।

ডিমলার এই দিনটি ছিল মূলত মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২২টি হুইলচেয়ার হয়তো খুব বড় কোনো বিনিয়োগ নয়, কিন্তু ২২টি পরিবারের জন্য এটি এক নতুন জীবনের শুরু। একইভাবে সেলাই মেশিন পাওয়া ১১ জন নারী এখন থেকে ঘরে বসে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি সহায়তাগুলো যদি এভাবে সরাসরি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়, তবে দারিদ্র্য বিমোচন ত্বরান্বিত হবে। ডিমলার মানুষ আশা করছে, জেলা প্রশাসনের এমন জনবান্ধব কার্যক্রম আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ