ডিগার্ডের হাতে মেজর খুন ও গণ-দলত্যাগ: খাদের কিনারায় মিয়ানমার জান্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বা তাতমাদোর ভেতরকার অস্থিরতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এখন তাদের নিজেদের দেহরক্ষীদের হাতেই প্রাণ হারাচ্ছেন। গত ২১ জুন কারেন রাজ্যের হপাপুন শহরতলির পাহাড়ি এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। সেখানে ১৯ নম্বর লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার মেজর কিয়াও মিন থান্টকে গুলি করে হত্যা করেছেন তার নিজেরই বডিগার্ড। এই বডিগার্ড কোনো পেশাদার সৈনিক ছিলেন না, বরং বাগো অঞ্চলের একজন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক যাকে মাত্র ৫ মাস আগে ঘর থেকে জবরদস্তি করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এই খুনের ঘটনার পরপরই ওই বডিগার্ডসহ ২২ জন সেনা সদস্য তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জান্তা বাহিনী যাদের জোর করে যুদ্ধে পাঠাচ্ছে, তারাই এখন জান্তার বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছে।

২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের পুরনো ‘পিপলস মিলিটারি সার্ভিস ল’ বা জবরদস্তিমূলক সামরিক নিয়োগ আইন সচল করে। এরপর থেকে ২৫টি ধাপে তারা প্রায় ১,২০,০০০ মানুষকে সেনাবাহিনীতে নাম লিখাতে বাধ্য করেছে। তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই ৬০,০০০ এর বেশি মানুষকে ঘর থেকে তুলে আনা হয়েছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৬০০% বেশি। জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং ভেবেছিলেন বিপুল জনবল বাড়িয়ে তিনি হারানো এলাকাগুলো ফিরে পাবেন। সাময়িকভাবে মায়াবতী বা লাশীয়র মতো কিছু শহরে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচারণা চালালেও বাস্তবে পরিস্থিতি জান্তার প্রতিকূলে। বর্তমানে ৮৭টি গুরুত্বপূর্ণ শহরের নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে। জান্তা বাহিনী এখন কেবল বড় শহরগুলোর মাঝখানে ব্যারাকে বন্দী অবস্থায় আছে, যেখানে তাদের রসদ সরবরাহও প্রায় ১০০% বন্ধ হওয়ার পথে।

জান্তার এই বিতর্কিত নিয়োগ নীতিতে বলা হয়েছিল যে, নতুন সেনাদের ২ বছর কাজ করতে হবে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে সেনাসংকট এতই তীব্র যে, ‘জরুরি অবস্থা’র দোহাই দিয়ে এই মেয়াদ এখন ৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জোরপূর্বক নিয়োগ পাওয়া সেনাদের মধ্যে মাত্র ১২% স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পেয়েছে। বাকিদের বড় একটা অংশ যুদ্ধে নিহত হয়েছে অথবা নিখোঁজ। কারেন ফ্রন্টের বিদ্রোহীরা জানান, তাদের প্রায়ই যুদ্ধ থামিয়ে দিতে হয় যাতে জান্তা বাহিনী তাদের নতুন রিক্রুট হওয়া সেনাদের লাশের স্তূপ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। এই নতুন সেনারা কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে মারা যাচ্ছে, যা জান্তা বাহিনীর ভেতরে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্তমান সামরিক কাঠামো ১৯৬২ সালের পর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি। তাদের ১০টি লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের (এলআইডি) সবকটিই এখন বিভিন্ন ফ্রন্টে ব্যস্ত। জান্তার হাতে কোনো সংরক্ষিত বা ‘রিজার্ভ ফোর্স’ নেই যারা ক্লান্ত সেনাদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। দেশের ২০টি রিজিওনাল মিলিটারি কমান্ডের (আরএমসি) মধ্যে ১৫টিই এখন সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত। এর মধ্যে আরএমসি-১৬ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরও ৩টি কমান্ড সেন্টার প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে। এই সামরিক ক্লান্তির কারণে জান্তা বাহিনী এখন ড্রোন ও বিমান হামলার ওপর বেশি নির্ভর করছে। কিন্তু বিমান হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে মারলেও তারা জমির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে না। জান্তার এই অদূরদর্শী নীতি এখন তাদের পুরো সামরিক শক্তিকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে।

সেনাবাহিনীর সাথে মিয়ানমারের সাধারণ বামার জনগোষ্ঠীর সামাজিক সম্পর্ক এখন পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে গেছে। মান্দালয়ের মতো শহরের জনপ্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে জান্তার নিয়োগকারী দলকে ‘মানব পাচারকারী’ হিসেবে ডাকছেন। ইয়াঙ্গুনের সাধারণ পরিবারগুলো এখন রাতের বেলা ঘুমাতে ভয় পায়, কারণ যেকোনো সময় তল্লাশির নামে তাদের তরুণ সন্তানদের তুলে নিয়ে যেতে পারে জান্তা। এই ভয়ের কারণে দেশের দক্ষ জনশক্তি এখন দেশ ছাড়ছে। বর্তমানে থাইল্যান্ডে প্রায় ২৩ লাখ নিবন্ধিত মিয়ানমার শ্রমিক রয়েছে, যাদের সংখ্যা অনিবন্ধিতদের ধরলে ৩ গুণ ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, দেশের উৎপাদনশীলতা ও মানুষের আয় দীর্ঘমেয়াদে অন্তত ৩০% থেকে ৪০% কমে যাবে। মিয়ানমারের প্রতি ৪ জন তরুণের মধ্যে ৩ জনই এখন পড়াশোনা বা কোনো প্রশিক্ষণে নেই, যা একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি।

জান্তার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো এখন বিশ্বজুড়ে অনলাইন স্ক্যাম, মাদক চোরাচালান এবং মানব পাচারের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তারা শাসনব্যবস্থায় ব্যর্থ হয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আইএলও ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষদের ফেরত পাঠালেই জান্তা তাদের সরাসরি যুদ্ধে পাঠিয়ে দিচ্ছে। থাইল্যান্ড ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোও এখন মিয়ানমার নাগরিকদের ফেরত পাঠাতে ভয় পাচ্ছে। কারণ তারা জানে, ফেরত পাঠানো মানেই তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। এই পরিস্থিতির সমাধান আসিয়ানের ৫ দফা শান্তিকমিটি বা আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের আগের ৬ মাসে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক জান্তার হামলায় নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বড় একটি অংশ বিমান হামলার শিকার। জান্তা একদিকে মানুষ তুলে নিয়ে সৈন্য বানাচ্ছে, অন্যদিকে সেই মানুষগুলোর পরিবারের ওপরেই বোমা ফেলছে। এই চক্র থেকে বের হতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জান্তার আর্থিক উৎস এবং বিমানের জ্বালানি সরবরাহ ১০০% বন্ধ করতে হবে। এছাড়া জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) ও অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে সরাসরি সহায়তা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে বলা যায়, মিয়ানমারের জান্তা এখন আর কোনো শক্তিশালী সংগঠন নয়, বরং এটি একটি ক্ষয়ে যাওয়া গোষ্ঠী যারা কেবল অস্ত্রের জোরে টিকে থাকতে চাচ্ছে। নিজেদের বডিগার্ডের হাতে যখন কমান্ডাররা খুন হন, তখন বুঝতে হবে জান্তার পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত জান্তাকে কোনো স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা। ফেডারেল গণতান্ত্রিক মিয়ানমার কোনো অলীক কল্পনা নয়, বরং এটি এখন মিয়ানমারের মানুষের দীর্ঘদিনের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে আসা এক অনিবার্য বাস্তবতা। জান্তা যত দ্রুত এটি বুঝতে পারবে, ততই তাদের জন্য মঙ্গলের।

সম্পর্কিত নিবন্ধ