শেখ হাসিনার ফেরার ইচ্ছা ও ভারতের আইনি অবস্থান: প্রত্যর্পণ নিয়ে কড়া বার্তা নয়াদিল্লির

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ প্রায় ৩ মাস ভারতে অবস্থানের পর সম্প্রতি তিনি দেশে ফেরার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা এবং তার দেশে ফেরার বিষয়ে ভারত সরকার খুব মেপে কথা বলছে। নয়াদিল্লি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বা তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ আইনি বিষয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অবস্থান বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরতে চান। তিনি বলেন, “আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর বর্তমানে ১০০% দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি আমার মৃত্যু লিখে রাখা থাকে, তবে আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই যেন সেই মৃত্যু হয়।” তার এই বক্তব্যে আবেগ থাকলেও আইনি বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে তাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনও করেছে।

নয়াদিল্লিতে গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালকে এই সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেন, “যেকোনো প্রত্যর্পণ বা কাউকে অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া একটি নিছক আইনি বিষয়। আমাদের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ীই এর নিষ্পত্তি হবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত বোঝাতে চেয়েছে যে, চাইলেই তারা রাতারাতি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে না, আবার তাকে চিরকাল সেখানে রাখার বিষয়েও কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এই আইনি মারপ্যাঁচে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াটি এখন দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই চুক্তির আওতায় কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন আসামিকে এক দেশ অন্য দেশের হাতে তুলে দিতে বাধ্য। তবে চুক্তিতে কিছু ফাঁকফোকরও রয়েছে, বিশেষ করে যদি অপরাধটি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়। ভারতের আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে ৯৫% থেকে ১০০% মামলা হয়েছে, সেগুলো সবই হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত। তাই ভারত তাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের দোহাই দিয়ে আটকে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মনে করে, এই চুক্তির আওতায় ভারতকে অবশ্যই শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে হবে।

ব্রিফিংয়ে কেবল শেখ হাসিনা নয়, বাংলাদেশে ভারতীয় অর্থায়নে চলা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়েও আলোচনা হয়। গত কয়েক বছরে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১১টি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছিল, যার বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর এই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত কি এই প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেবে? রণধীর জয়সোয়াল আশ্বস্ত করে বলেন, “আমাদের উন্নয়নমূলক সহযোগিতা প্রকল্পগুলো দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত হয়। পরিস্থিতি যাই হোক, আমরা চাই এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক।” এর ফলে বোঝা যাচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের সাথে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না।

বর্তমানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার দাবি ৮০% থেকে ৯০% জোরালো হয়েছে। জুলাই ও আগস্ট মাসে যে ভয়াবহ সহিংসতা হয়েছে, তার বিচার নিশ্চিত করতে হাসিনাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি। অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। তবে ভারত সরকার এখনই কোনো চটজলদি সিদ্ধান্তে যেতে নারাজ। তারা বিষয়টিকে আদালতের ওপর ছেড়ে দিতে চায়। রণধীর জয়সোয়াল উল্লেখ করেন যে, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের নীতিতে এখন পর্যন্ত কোনো বদল ঘটেনি। তিনি ভারতে অতিথি হিসেবে অবস্থান করছেন এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের দায়িত্ব।

নয়াদিল্লির এই অনমনীয় কিন্তু আইনি অবস্থানের কারণে ঢাকার সাথে দিল্লির সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে পারে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ভারত হয়তো শেখ হাসিনাকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। কারণ তাকে বাংলাদেশে ফেরত দিলে ভারতের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এক বন্ধুকে বিপদে ফেলা হবে, আবার না দিলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে সম্পর্কের অবনতি হবে ১০০% নিশ্চিত। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন মোদী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ডিসেম্বরে ফেরার যে কথা শেখ হাসিনা বলেছেন, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে।

পরিশেষে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার বিষয়টি কেবল ঢাকা বা নয়াদিল্লির আলোচনার ওপর নির্ভর করছে না, বরং এটি দুই দেশের বিচারিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের ওপরও নির্ভর করবে। বাংলাদেশ সরকার যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের স্বপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ভারতের হাতে তুলে দিতে পারে, তবে ভারতের জন্য তাকে আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সাধারণ মানুষ আশা করছে, রক্তের বিনিময়ে আসা এই নতুন বাংলাদেশে সব অপরাধীর বিচার হবে এবং ভারত তার প্রতিবেশী সুলভ আচরণের পরিচয় দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ