দেশের শিক্ষা অঙ্গনে গত কয়েকদিন ধরে চলা অস্থিরতা ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অবশেষে নমনীয় হলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক বিল পাসের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বড় ঘোষণা দিয়েছেন। মন্ত্রী জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও নানা প্রতিকূলতার কারণে যারা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের কথা চিন্তা করে পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা এই তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করবে সরকার। একইসাথে শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা তার ব্যক্তিগত মন্তব্যের জন্য তিনি সংসদে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এই ঘোষণার ফলে আন্দোলনের উত্তাপ কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশন যখন চলছিল, তখন বাইরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল। এই বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমরা যখন ভেতরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা করছি, তখন আমাদের প্রিয় শিক্ষার্থীরা বাইরে ব্যারিকেড ভেঙে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবিগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক।” শফিকুল ইসলাম সরকারকে অনুরোধ করেন যেন শিক্ষার্থীদের সাথে দ্রুত আলোচনায় বসে এই সমস্যার সমাধান করা হয়। কারণ এই মুহূর্তে ১০০% শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং তাদের এই মানসিক যন্ত্রণা দূর করা সরকারের দায়িত্ব।
সংসদ সদস্যের এই প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে অনেক পর্যালোচনা করেছি। গত সোমবার যখন পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, তখন সারা দেশে ভয়াবহ বৃষ্টি ছিল। অনেক পরীক্ষার্থী ভিজে কেন্দ্রে গেছে, অনেকের যাতায়াতে সমস্যা হয়েছে এবং অনেকে ঠিকভাবে পরীক্ষা দিতে পারেনি বলে অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে।” তিনি আরও বলেন, সরকার সবসময় শিক্ষার্থীদের কল্যাণের কথা ভাবে। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই তিনটি বিষয়ের পরীক্ষা আবার নেওয়ার বিষয়টি তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও যোগ করেন যে, বন্যার কারণে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি জেলায় পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই বোর্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন করে পরীক্ষার সূচি তৈরি করা হবে। মন্ত্রী বলেন, “আমরা ভেবে দেখেছি, চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা যখন আমরা পুনরায় নিতে যাব, ঠিক তখনই সারা দেশের ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব ইনশাআল্লাহ।” এই সিদ্ধান্তের ফলে অন্তত ৮০% শিক্ষার্থী যারা বৃষ্টির কারণে পরীক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তারা নতুন করে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
তবে কেবল পরীক্ষার বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের বড় ক্ষোভ ছিল মন্ত্রীর একটি মন্তব্য নিয়ে। অভিযোগ উঠেছিল যে, তিনি শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগী’ বলে সম্বোধন করেছেন। এই অপমানজনক মন্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগ দাবি করে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে সংসদে দুঃখ প্রকাশ করে মিলন বলেন, “আমার ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে ছোট করার জন্য কিছু বলিনি। তবুও যদি আমার কথায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে আমি সিম্পলি (সহজভাবে) দুঃখ প্রকাশ করছি।” মন্ত্রীর এই ক্ষমা প্রার্থনাকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখনো তার পদত্যাগের দাবিতে অনড়।
শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর সংসদ কক্ষের ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। গত ২-৩ দিনে দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর সামনে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তাতে জনজীবনে ভোগান্তি বেড়েছিল প্রায় ২০০%। অনেক অভিভাবকও রাস্তায় নেমে এসেছিলেন তাদের সন্তানদের অধিকার আদায়ের জন্য। মন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। এখন সরকার চাচ্ছে কোনোভাবেই যেন কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে প্রভাব না পড়ে। তাই নতুন সূচি অনুযায়ী পরীক্ষার মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা মন্ত্রীর এই ঘোষণা পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা চান কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হোক। উল্লেখ্য যে, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৭০% রাস্তাঘাট তলিয়ে গিয়েছিল, যার ফলে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা দেরি হয়েছিল। অনেকে রাস্তায় পানির কারণে অটোরিকশা বা বাস খুঁজে পাননি। এমন চরম পরিস্থিতিতে পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া যে কোনো শিক্ষার্থীর জন্য অসম্ভব ছিল। সরকার এখন সেই ভুল সংশোধনের পথেই হাঁটছে।
পরিশেষে, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন নতুন সূচি তৈরির কাজ শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের আশা, রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত এই সংকট মোকাবিলা করা হবে। ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়ার মতো শিক্ষা খাতের এই বড় সমস্যাটিও যেন অনতিবিলম্বে সমাধান হয়, এটাই এখন সবার চাওয়া। শিক্ষার্থীদের রাজপথ ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের এই নমনীয় মনোভাব একটি সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
















