স্পেনের ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপে’ চূর্ণ ফ্রান্স: ডলাসে ফরাসিদের দম আটকে দিল স্প্যানিশ কৌশল

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বনের বিশাল সাপ অ্যানাকোন্ডা তার শিকারকে মারার জন্য কোনো বিষ ব্যবহার করে না। সে শুধু তার শক্তিশালী শরীর দিয়ে শিকারকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরে। শিকার যত বেশি নড়াচড়া করে, অ্যানাকোন্ডার প্যাঁচ তত বেশি শক্ত হয়। এক পর্যায়ে শিকারের হাড়গোড় ভেঙে যায় এবং শ্বাস রোধ হয়ে মারা যায়। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্সকেও ঠিক এভাবেই বিষহীন কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী এক মরণকামড়ে স্তব্ধ করে দিল স্পেন। বিশ্বকাপের উত্তেজনাকর সেমিফাইনালে স্পেনের এই কৌশলী ফুটবলের কাছেই মূলত চূর্ণ হয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্পেনের এই কৌশলকে নাম দিয়েছে ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ’।

ডলাসের সেমিফাইনাল যারা দেখেছেন, তাদের কাছে এই উপমাটি মোটেও বাড়িয়ে বলা মনে হবে না। পুরো ৯০ মিনিটের ম্যাচে স্পেনের মিডফিল্ড এবং রক্ষণভাগ ফরাসি খেলোয়াড়দের এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে, তারা মাঠের কোথাও ফাঁকা জায়গা খুঁজে পায়নি। কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা উসমান দেম্বেলেদের মতো গতির রাজারাও স্প্যানিশদের এই ট্যাকটিক্যাল প্যাঁচের মধ্যে পড়ে বারবার খেই হারিয়েছেন। স্পেনের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা রদ্রি এবং তরুণ তুর্কি পাউ কুবারসিরা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করে নিয়েছিলেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ম্যাচের প্রায় ৬০% সময় বল ছিল স্প্যানিশদের দখলে। ফ্রান্সের ফুটবলাররা যখনই বল পাচ্ছিলেন, তখনই স্পেনের ৩ থেকে ৪ জন খেলোয়াড় তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছিলেন।

ম্যাচের আগে বড় আলোচনা ছিল ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে নিয়ে। ১৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্য থাকা এমবাপ্পে এই টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে ৮টি গোল করে ফর্মের তুঙ্গে ছিলেন। কিন্তু সেমিফাইনালে তাকে বোতলবন্দি করে রাখার জন্য স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে আগে থেকেই ছক কষে রেখেছিলেন। স্প্যানিশ সাংবাদিক গিলেম বালাগ জানিয়েছেন, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ১০ বছরের দীর্ঘ পরিকল্পনা। লুইস দে লা ফুয়েন্তে যখন স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলের কোচ ছিলেন, তখন থেকেই এই খেলোয়াড়দের গড়ে তুলেছেন। আজকের রদ্রি কিংবা মার্ক কুকুরেয়ারা সেই ছোটবেলা থেকেই জানেন কীভাবে বিপক্ষ দলের পাসের লাইন বন্ধ করে দিয়ে তাদের দম আটকে দিতে হয়। ১০ বছর আগে শুরু হওয়া সেই অভিযাত্রা আজ পূর্ণতা পেল বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার মাধ্যমে।

ম্যাচ শেষে নিজের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেছেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনি ফরাসি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “কৌশলগতভাবে আমরা কোনোভাবেই তাদের সাথে পেরে উঠিনি। আমরা চেয়েছিলাম প্রথম থেকেই হাই-প্রেস করে তাদের ছন্দ নষ্ট করতে, কিন্তু আমরা সেটা ১০০% ব্যর্থ হয়েছি।” এমবাপ্পে আরও যোগ করেন, “মাঝমাঠে আমরা বারবার নিজেদের হারিয়ে ফেলছিলাম। দেখা যাচ্ছিল মাঝমাঠে আমাদের ২ জন খেলোয়াড়ের বিপরীতে স্পেনের ৩ জন খেলোয়াড় সবসময় অবস্থান করছিল। স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে ৩ বনাম ২ পরিস্থিতি তৈরি হওয়া মানে পরাজয় নিশ্চিত করা।” এমবাপ্পের এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, স্পেনের পরিকল্পনা কতটা নিখুঁত ছিল।

স্পেনের এই জয়ের নেপথ্যে থাকা কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এখন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নাম। তিনি সবসময় একটি নির্দিষ্ট দর্শন নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। ম্যাচ শেষে অত্যন্ত আনন্দিত মনে তিনি বলেন, “প্রায় ৪ বছর আগে আমরা এই দর্শন নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলাম এবং আজ তার সুফল পাচ্ছি। আমরা যে অজেয়, সেটা ছেলেরা মাঠে প্রমাণ করেছে।” তিনি মনে করেন, স্পেনের এই বর্তমান দলটি বিশ্বের যেকোনো রক্ষণের দেয়াল ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তার মতে, খেলোয়াড়দের মধ্যে যে সংহতি এবং প্রতিভা রয়েছে, তার ফলাফল এই ফাইনালে ওঠা। বর্তমান বিশ্বে ফুটবলের প্রতিটি একাডেমিতে স্পেনের এই নিয়ন্ত্রিত ফুটবলকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম এই পরাজয়ের জন্য কিছুটা দুর্ভাগ্যকেও দায়ী করেছেন। তবে স্পেনের মাঝমাঠের আধিপত্য তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। ফ্রান্সের মিডফিল্ডে চুয়ামেনি এবং আদ্রিয়ান রাঁবিওরা আপ্রাণ চেষ্টা করলেও রদ্রি এবং ওলমোদের পাসিং ফুটবলের সামনে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। স্পেনের রক্ষণভাগ এমনভাবে দেয়াল তুলে দিয়েছিল যে, ফ্রান্সের মতো দলও পুরো ম্যাচে মাত্র ১০% বার তাদের বক্সে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম একপেশে সেমিফাইনাল হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যেখানে বড় নামগুলো কৌশলের কাছে হার মেনেছে।

এখন ফুটবল বিশ্বের নজর আগামী রবিবারের ফাইনালের দিকে। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেই মহা-রণক্ষেত্রে স্পেনের প্রতিপক্ষ হবে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ড। স্পেনের সমর্থকরা এখন থেকেই উৎসবে মেতেছেন। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের এই ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ’ ফাইনালের প্রতিপক্ষকেও একইভাবে ধরাশায়ী করবে। যদি স্পেন শিরোপা জিততে পারে, তবে ফুটবলের ইতিহাসে স্প্যানিশ কৌশলের এই নতুন অধ্যায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ডলাসের এই হার ফরাসিদের জন্য বড় এক শিক্ষা হয়ে থাকবে যে, কেবল ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে নয়, নিখুঁত দলীয় কৌশলই ফুটবলের আসল রাজা।

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে স্পেন যেভাবে দাপট দেখিয়েছে, তাতে তারা এখন বিশ্বকাপের মূল দাবিদার। ৯৫% ফুটবল বিশেষজ্ঞই মনে করছেন, বর্তমান স্প্যানিশ দলকে হারানো এখন যে কারোর জন্যই দুঃসাধ্য ব্যাপার। এমবাপ্পেদের চোখের জল আর স্প্যানিশদের বিজয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে ডলাসের রাতটি শেষ হলেও ফুটবল প্রেমীদের মনে দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে সেই ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ’। স্পেনের ফুটবল এখন আর শুধু বল পজিশন নয়, বরং প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক নতুন শিল্পে পরিণত হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ