ডিসেম্বরে ফিরছেন শেখ হাসিনা: আত্মসমর্পণ নাকি নতুন রাজনৈতিক চাল?

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে অবশেষে দেশে ফেরার দিনক্ষণ ঘোষণা করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি সরাসরি দেশে ফেরার কথা জানালেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আগামী ডিসেম্বরেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তবে এটি কি কেবল আবেগতাড়িত ঘোষণা, নাকি দলকে আবার মাঠে নামানোর কোনো গভীর রাজনৈতিক কৌশল তা নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের ভেতরেই চলছে নানা আলোচনা। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা এই খবরে কিছুটা আশাবাদী হলেও শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাই এখন গ্রেফতার ও নিরাপত্তার ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন।

শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছিল এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, সেই সময় প্রায় ১,৪০০ (১,৪০০) মানুষ নিহত হয়েছেন, যার বড় একটি অংশই ছিল ছাত্র ও সাধারণ জনতা। এই বিপুল প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ে হওয়া শত শত মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা এখন দিল্লিতে অবস্থান করছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমাকে ফিরতেই হবে। আমার বাবা-মায়ের রক্ত এই মাটিতে মিশে আছে, আমি চাইলেই দূরে থাকতে পারি না।” তিনি নির্বাসনে থাকা দলের নেতাদেরও তার সাথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, গত আগস্টের পর থেকে দলের প্রায় ৯০% (৯০%) শীর্ষ নেতা এখন আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে আছেন।

আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা বেশ শোচনীয়। গত বছরের মে মাসে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম আদালতের নির্দেশে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর থেকে মাঠের রাজনীতিতে দলটির কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বর্তমানে দলের প্রায় ৮০% (৮০%) কার্যক্রম কেবল ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ। শেখ হাসিনা দাবি করেছেন যে, তিনি ইতোমধ্যে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১২৫টি (১২৫) আসনের নেতা-কর্মীদের সাথে অনলাইনে কথা বলে তাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু মাঠের নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, যেখানে সাধারণ একটি ঝটিকা মিছিল বের করলেই পুলিশি অ্যাকশনের শিকার হতে হচ্ছে, সেখানে ডিসেম্বরে সরাসরি ফিরে আসাটা কতটা বাস্তবসম্মত হবে তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।

আইনি দিক থেকে শেখ হাসিনার সামনে এখন পাহাড়সমান বাধা। গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই-আগস্টের গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এর বাইরেও তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০০টিরও বেশি হত্যা মামলা চলমান রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। এমনকি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে চিঠি দিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা যদি ডিসেম্বরে ফেরেন, তবে তাকে সরাসরি কারাগারে যেতে হবে এটি প্রায় ১০০% (১০০%) নিশ্চিত।

দলের ভেতরেও নেতৃত্বের সংকট স্পষ্ট। শেখ হাসিনা যখন ফেরার কথা বলছেন, তখন অনেক নেতা ইতোমধ্যে ভারত ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই বা কানাডায় চলে গেছেন। তাদের অনেকেই মনে করছেন, এই মুহূর্তে দেশে ফেরা মানেই হলো নিশ্চিত গ্রেফতার এবং দীর্ঘমেয়াদী কারাবরণ। আওয়ামী লীগের একজন সাবেক সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “নেত্রী ফেরার কথা বলছেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গণহারে ফেরার সম্ভাবনা কম।” ফলে শেখ হাসিনার এই ঘোষণা কর্মীদের চাঙ্গা করার একটি সাময়িক ‘টনিক’ হিসেবে কাজ করলেও এটি কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক মুভমেন্টে রূপ নেবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতারা শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বর্তমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম কড়া ভাষায় বলেছেন, “আমরাও চাই তিনি দেশে ফিরুন, তবে তা রাজনৈতিক সভা করার জন্য নয়, বরং তার বিরুদ্ধে ঘোষিত ফাঁসির রায় কার্যকর করার জন্য।” বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও মনে করেন, এটি শেখ হাসিনার একটি সস্তা রাজনৈতিক প্রচার। তিনি জানান, আদালত থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই সরকার বিষয়টিকে আইনিভাবেই দেখছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শেখ হাসিনা দেশে পা রাখামাত্রই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অবস্থান একটি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চাইছে, অন্যদিকে ভারত দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের খাতিরে তাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণার পেছনে ভারতের কোনো প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকতে পারে। তারা হয়তো চাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় থাকুক। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখনো যে পর্যায়ে আছে, তাতে আওয়ামী লীগকে অদূর ভবিষ্যতে মাঠে নামতে দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

সব মিলিয়ে ডিসেম্বরের এই ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। যদি শেখ হাসিনা সত্যিই ফেরেন, তবে সেটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি ঘটনা। আর যদি তিনি না ফেরেন, তবে এটি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি ‘কথার কথা’ হিসেবেই থেকে যাবে। আওয়ামী লীগের ভাগ্য এখন ঝুলে আছে ডিসেম্বরের সেই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের ওপর। নেতা-কর্মীরা এখন প্রহর গুনছেন তাদের নেত্রীর পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য, আর সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছে আদালতের রায়ের বাস্তবায়নের দিকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ