ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘সাইম টেলিকম’ এখন স্থানীয় মানুষের আলোচনার প্রধান বিষয়। গত ২০ জুন ২০২৫ তারিখে নগরীর হারুন টাওয়ারে অবস্থিত এই সুপরিচিত মোবাইল দোকানে এক দুঃসাহসিক ও সুপরিকল্পিত লুটতরাজ চলে। দোকান মালিক আতিকুর রহমান খানের দাবি অনুযায়ী, ওইদিন দোকান থেকে দামী স্মার্টফোন সেটসহ প্রায় সাড়ে ৮৬ লক্ষ টাকার বিপুল মালামাল লুট হয়ে যায়। এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতিতে ব্যবসায়ী আতিকুর পুরোপুরি পথে বসার উপক্রম হয়েছিলেন। তবে দীর্ঘ কয়েক মাসের তদন্ত আর পুলিশের কঠোর তৎপরতার পর অবশেষে লুন্ঠিত মালামালের একটি অংশ উদ্ধার হয়েছে। তবে মালামাল উদ্ধারের চেয়েও সাধারণ মানুষকে বেশি চমকে দিয়েছে এই ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত গোলাম আম্বিয়া হারুনের ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকার দিকগুলো।
ঘটনার শুরু থেকেই আতিকুর রহমান কোতোয়ালী থানায় ন্যায়বিচারের আশায় অভিযোগ দায়ের করেন, যার মামলা নম্বর ৭৯(৬)২০২৫। মামলার প্রধান আসামি গোলাম আম্বিয়া হারুন চতুরতার সাথে উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে বাইরে ঘুরলেও তার অপকর্মের সহযোগীরা একে একে ধরা পড়ছে। গত ৬ জুলাই পুলিশ হারুনের ম্যানেজার তাপস সাহাকে গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া স্বীকারোক্তিতেই বেরিয়ে আসে এই বিশাল চুরির ভেতরের কাহিনী। তাপস জানায় যে, এই লুণ্ঠিত মালামালের পেছনে আবু রায়হান জহির ও সাব্বির নামে আরও দুইজনের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। এরপর পুলিশি অভিযানে ৯ অক্টোবর জহিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর জহির সত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই গত ১৫ অক্টোবর ভোররাতে পুলিশ প্রায় ৫০ হাজার টাকার সমপরিমাণ আসবাবপত্র ও দোকানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ এক্সেসরিজ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
দোকান মালিক আতিকুর রহমান জানান, তার দোকানে প্রায় $৭৫,০০০ (পঁচাত্তর হাজার ডলার) বা ৮৬.৫ লক্ষ টাকার মালামাল মজুত ছিল। লুটতরাজের সময় প্রায় ১০০% দামী স্মার্টফোন সেটগুলো আলমারি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, হারুন তার নিজের ছেলেদের এবং একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় এই মালামালগুলো বিভিন্ন জায়গায় পাচার করে দিয়েছে। তবে পুলিশ তদন্তে অনেক দূর এগিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে পুলিশ ইতোমধ্যে আরও ৩ থেকে ৪টি দামী মোবাইল সেট উদ্ধার করেছে। বর্তমানে তদন্তের যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তাতে অন্তত আরও ৬০% মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আশা প্রকাশ করছেন। পুলিশের চৌকস দল এখন হারুনের পাচারকৃত বাকি মালামালের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে।
তদন্ত যত গভীরে যাচ্ছে, হারুনের ব্যক্তিগত জীবনের নানা কুৎসিত এবং ‘রোমাঞ্চকর’ অধ্যায়গুলো ততই সাধারণ মানুষের সামনে চলে আসছে। প্রাপ্ত বিভিন্ন গোপন ভিডিও ফুটেজ, অডিও রেকর্ড এবং ছবি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হারুন কেবল একজন অভিযুক্ত ব্যবসায়ী নন, বরং তিনি একটি ভয়ংকর অপরাধী চক্রের হোতা। ময়মনসিংহের সিকে ঘোষ রোড এলাকায় তার আস্তানায় নিয়মিত মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের আসর বসত। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, হারুন অর্থের বিনিময়ে একাধিক নারী ও পুরুষকে তার এই কু-কর্মের সঙ্গী হিসেবে ব্যবহার করতেন। ইয়াবা, বিদেশি মদ ও গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে তারা সারা রাত সেখানে উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও হৈচৈ করত। নেশার ঘোরে কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলত, আবার কেউ অশালীন ও উশৃঙ্খল আচরণে লিপ্ত হতো।
হারুনের এই বেপরোয়া জীবনযাপনের কারণে আশপাশের সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। নিজেকে ‘আইনশৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে’ মনে করায় তিনি প্রকাশ্যে অপরাধ করতেও ভয় পেতেন না। তিনি নিজেকে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে জাহির করতেন এবং সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন সময় ভয়-ভীতি দেখাতেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন ভোর সকালে তার আস্তানা থেকে অদ্ভুত সব নারী-পুরুষদের বের হয়ে যেতে দেখা যেত। সিকে ঘোষ রোডের মানুষের কাছে হারুন এখন এক ঘৃণিত নাম। সেখানকার বয়স্ক ব্যক্তিরা আক্ষেপ করে বলেন, হারুন বয়সের সাথে সাথে আরও বেশি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে। তার এই কুকীর্তি কেবল তার পরিবারের জন্য নয়, বরং গোটা সমাজের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ময়মনসিংহের সচেতন মহল মনে করছে, হারুনের মতো অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সমাজে অস্থিরতা আরও বাড়বে। লুট হওয়া সাড়ে ৮৬ লক্ষ টাকার মালামাল উদ্ধারের পাশাপাশি তার এই মাদক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। পুলিশ জানিয়েছে, তারা হারুনের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে এবং তার অবৈধ অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত করছে। মামলার বাদী আতিকুর রহমান আশাবাদী যে, পুলিশ যদি তাদের তদন্তের বর্তমান গতি বজায় রাখে, তবে খুব শীঘ্রই মূল অপরাধীরা আইনের কঠোর কবলে পড়বে। তিনি আরও বলেন, “আমি আমার ৮৬ লক্ষ টাকার মধ্যে হয়তো সামান্য কিছু ফিরে পেয়েছি, কিন্তু আমি চাই এই অপরাধী চক্র যেন আর কোনো ব্যবসায়ীর স্বপ্ন লুট করতে না পারে।”
এই লুণ্ঠন ও অসামাজিক কার্যকলাপের ঘটনাটি ময়মনসিংহের আইনশৃঙ্খলার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ ব্যবসায়ীরা এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকলেও পুলিশের সাম্প্রতিক মালামাল উদ্ধারের ঘটনায় তারা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। হারুনের কুকর্মের গোমর ফাঁস হওয়ার পর থেকে শহরের বিভিন্ন মোড়ে ও চায়ের দোকানে তাকে নিয়ে নিন্দা ও ঘৃণার আলোচনা চলছে। মানুষ এখন অপেক্ষায় আছে মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য। যদি হারুন এবং তার সহযোগীদের যথোপযুক্ত শাস্তি হয়, তবে তা ময়মনসিংহের অন্যান্য অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে যে কেউ নয়—তা আবারও প্রমাণিত হবে এই মামলার মাধ্যমে।
ভোর হওয়ার আগেই হারুনের আস্তানায় যে উৎসব চলত, তা আজ বিচারের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এখন অনেক বেড়েছে। তারা আশা করছেন, কেবল ৩০% বা ৪০% নয়, বরং লুন্ঠিত মালামালের সিংহভাগই উদ্ধার হবে এবং ময়মনসিংহের রাজপথ থেকে মাদক ও অপরাধী চক্রের সম্পূর্ণ অবসান ঘটবে। এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পাপের অনাচার কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়। ময়মনসিংহের মানুষ এখন সুন্দর ও শান্ত একটি শহরের স্বপ্ন দেখছে, যেখানে আর কোনো সাইম টেলিকম লুট হবে না।














