ঢাকার সেগুনবাগিচার আকাশটা সেদিন ছিল মেঘমুক্ত, আর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন ছিল তারার মেলায় উজ্জ্বল। ঝালকাঠির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা এক প্রতিভাময়ী বাউল শিল্পী মোসাঃ ছালমা বেগমের জন্য দিনটি ছিল পরম স্বপ্নের। নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে লোকসংগীতের যে ভুবন তিনি সাজিয়েছেন, তার এক অনন্য স্বীকৃতি মিলল এদিন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং দেশের বিশিষ্ট কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের হাত থেকে তিনি গ্রহণ করলেন ‘গুণীশিল্পী সম্মাননা ২০২৬’। ঢাকার রামপুরায় অবস্থিত বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নখদর্পণ সংগীত একাডেমি’র প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়। বাউল ছালমার এই সাফল্য কেবল তার নিজের নয়, বরং গোটা ঝালকাঠি জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক বিশাল গর্বের খবর।
১০ জুলাই ২০২৬ তারিখের সেই পড়ন্ত বিকেলে অনুষ্ঠানটি শুরু হয় ঠিক ৪টার দিকে। অ্যাডভোকেট আক্তার হোসেন রিপনের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় মিলনায়তনটি কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। নখদর্পণ সংগীত একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আফরিনা পারভীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি যেন এক সুরের সমুদ্রে রূপ নেয়। যখন বাউল ছালমার নাম ঘোষণা করা হলো, তখন উপস্থিত প্রায় ১০০% দর্শক তুমুল করতালির মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ১০০ জন বরেণ্য কণ্ঠ ও যন্ত্রশিল্পীর উপস্থিতিতে এই সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। ছালমা বেগম যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে সম্মাননা গ্রহণ করছিলেন, তখন তার চোখে ছিল সার্থকতার জল আর মুখে ছিল হাজার ওয়াটের হাসি।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রেজাউদ্দিন স্টালিন তার বক্তব্যে বাউল ছালমার মতো তৃণমূলের শিল্পীদের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “বাউলরাই আমাদের মাটির আসল সুরকে বিশ্বদরবারে বাঁচিয়ে রেখেছেন।” তিনি আরও জানান যে, সরকার বর্তমানে দেশের সাংস্কৃতিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.৮% বা ১% এই খাতে খরচ হলেও আগামীতে তা অন্তত ৫% করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এছাড়াও দেশের পিছিয়ে পড়া শিল্পীদের জন্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাবনা রয়েছে। মন্ত্রী-এমপিদের পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমি চায় গ্রামের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাদের আলোতে নিয়ে আসতে। এই ধরনের উদ্যোগের ফলে বাউল ছালমার মতো শিল্পীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের মান উজ্জ্বল করতে পারবেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাংলা গানের কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক মিল্টন খন্দকার এবং জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মনির খান। তাদের মতো বড় মাপের মানুষদের সামনে সম্মাননা পাওয়া ছালমার জন্য ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। মনির খান তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা যখন গান শুরু করেছিলাম, তখন এত সুযোগ ছিল না। আজ নখদর্পণ সংগীত একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্পীদের যে প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।” অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০ জন বাছাইকৃত গুণী শিল্পীকে তাদের বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। উপস্থিত অতিথিরা মনে করেন, এই ধরনের স্বীকৃতি পেলে শিল্পীরা তাদের সাধনায় আরও বেশি মনোযোগী হন।
বাউল ছালমা দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লোকগান ও বাউল তত্ত্বের সাথে যুক্ত। ঝালকাঠির স্থানীয় বিভিন্ন উৎসবে গান গেয়ে তিনি সাধারণ মানুষের মন জয় করেছেন। এবারের সম্মাননা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই তার কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হন। নখদর্পণ সংগীত একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা আফরিনা পারভীন জানান, তার এই একাডেমি পরিচালনার জন্য তিনি প্রায় ২০% ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করেন এবং বাকিটা আসে বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ীদের থেকে। তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন একটি দিনের, যখন প্রতিটি গ্রাম থেকে একজন করে বাউল শিল্পী বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করবে। তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান যাতে বেসরকারি পর্যায়ের এমন ছোট ছোট একাডেমিগুলোকে অন্তত ১০% আর্থিক অনুদান দিয়ে সহায়তা করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের পরিচিত মুখ মোঃ গোলাম সরোয়ার এবং কবি আসাদ কাজল। এছাড়াও অধ্যাপক মাহবুবা বেগম এবং সংগীত পরিচালক দেলোয়ার আরজুদা শরফের মতো গুণী মানুষেরা অনুষ্ঠানে প্রাণের সঞ্চার করেন। বাউল ছালমা সম্মাননা নেওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমি মেঠোপথের গান গাই, গ্রামের মানুষের গান গাই। আজ ঢাকার এত বড় বড় মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।” তিনি আরও জানান, এই সম্মাননা তাকে বাউল দর্শন চর্চায় আরও এক ধাপ এগিয়ে দেবে। তার এই সাফল্যে ঝালকাঠির স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে।
আলোচনা সভা শেষ হওয়ার পর শুরু হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে বাউল ছালমাসহ আরও বেশ কয়েকজন শিল্পী গান পরিবেশন করেন। দর্শকদের প্রায় ৯০% অংশই গানের প্রতিটি কলির সাথে তাল মিলিয়েছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত তেজগাঁও কলেজের অধ্যাপক মাহবুবা বেগম বলেন, “সংগীত মানুষের আত্মাকে শুদ্ধ করে।” বাউল ছালমার গান শুনে সবাই বুঝতে পেরেছেন যে, কেন তাকে এই গুণীশিল্পী সম্মাননার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানটি রাত পর্যন্ত চললেও দর্শকদের ক্লান্তি ছিল না বললেই চলে। পরিশেষে, আফরিনা পারভীন সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের প্রথম দিনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
সব মিলিয়ে বাউল ছালমার এই অর্জন কেবল একটি ট্রফি বা সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায়ের শিল্পীদের জন্য একটি বড় আশার বাণী। যখন একজন বাউল শিল্পী শিল্পকলা একাডেমির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সম্মানিত হন, তখন প্রান্তিক পর্যায়ের সকল শিল্পীই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেন। ঝালকাঠির বাউল ছালমা বেগমের এই গৌরবগাথা চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে এবং আগামী প্রজন্মের বাউল শিল্পীদের জন্য এটি হবে এক আলোর দিশারি। আগামী দিনগুলোতে তার এই জয়যাত্রা আরও দীর্ঘ হোক, এটাই আজ ঝালকাঠিবাসীসহ দেশের সকল সংগীতপ্রেমীদের কামনা।














