গ্রামগঞ্জে গৃহস্থ পরিবারের নারীদের আয়ের অন্যতম একটি বড় উৎস হলো হাঁস-মুরগি পালন। অনেক গরিব পরিবার এই হাঁস-মুরগি বা এর ডিম বিক্রি করেই তাদের দৈনন্দিন সংসারের ছোটখাটো খরচ মেটায়। কিন্তু ইদানীং চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই হাঁস-মুরগি চুরির ঘটনা বেশ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গিয়েছিল। অবশেষে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার চাকুলিয়া গ্রামে হাঁস-মুরগি চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র। এই চুরির অপরাধে স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছে আদালত। রবিবার, ৫ জুলাই দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে এই কারাদণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চোর চক্রটি ধরা পড়ায় গ্রামের সাধারণ মানুষ এখন বেশ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন।
আদালতের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এই তিন অপরাধীর পরিচয় পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এরা হলেন—দর্শনা মোহাম্মদপুর মেথরপট্টি এলাকার মৃত দিলীপ কুমার দাসের ছেলে শ্রী সুজন কুমার দাস (৫০), তার স্ত্রী ময়না রানী (৩৬) এবং একই এলাকার বাসিন্দা মৃত নবীছদ্দিনের স্ত্রী রেখা খাতুন (৫৮)। পুলিশ জানায়, এরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে কৌশলে হাঁস-মুরগি চুরি করে আসছিল। চুরি করা এই হাঁস-মুরগিগুলো তারা স্থানীয় বাজারে বা পরিচিত ব্যবসায়ীদের কাছে খুব সস্তায় বিক্রি করে দিত। হয়তো একটি দেশি মুরগি বিক্রি করে তারা ৪বা৫(ডলার) সমমূল্যের ৩শ থেকে ৪০০ টাকা পেত, কিন্তু এর মাধ্যমে তারা গ্রামের গরিব মানুষের অনেক বড় আর্থিক ক্ষতি করত।
ঘটনার সূত্রপাত হয় শনিবার, ৪ জুলাই সকালে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, ওই দিন সকালে এই তিন চোর চাকুলিয়া গ্রামের মাঝপাড়ার বাসিন্দা মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে অত্যন্ত সুকৌশলে প্রবেশ করে। বাড়ির লোকজন কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগে তারা বেশ কয়েকটি হাঁস ও মুরগি ধরে একটি বস্তায় ভরার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের এই অপচেষ্টা বেশি দূর এগোতে পারেনি। হাঁস-মুরগির অস্বাভাবিক ডাকাডাকি শুনে বাড়ির মালিক মোফাজ্জল হোসেন ও আশপাশের স্থানীয় লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে যান। তারা দ্রুত ছুটে এসে এই তিনজনকে একেবারে হাতে-নাতে আটক করেন। চোরেরা স্বামী-স্ত্রী ও বয়স্ক নারী হওয়ায় প্রথমে অনেকেই অবাক হন, তবে পরে স্থানীয় জনতা তাদের আটকে রেখে সাথে সাথে দর্শনা থানায় খবর দেন।
গ্রামের মানুষের কাছ থেকে চোর আটকের খবর পেয়ে একটুও দেরি না করে দর্শনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তৌহিদুল রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে এবং স্থানীয়দের উপস্থিতিতে আটককৃত তিনজনকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। থানায় এনে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ওই তিনজন পুলিশের কাছে তাদের চুরির বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে নেয়। এরপর তাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয় এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের চুয়াডাঙ্গার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়।
আসামিদের আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক পুরো ঘটনার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অপরাধের ধরন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করেন। সব প্রমাণ খতিয়ে দেখার পর আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চুরির মূল পরিকল্পনাকারী শ্রী সুজন কুমার দাসকে সর্বোচ্চ ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া তার স্ত্রী ময়না রানী এবং তাদের আরেক সহযোগী রেখা খাতুনকে ১৫ দিন করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অপরাধ ছোট হলেও আদালত কোনো ছাড় দেননি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ছোট অপরাধে দ্রুত সাজা নিশ্চিত করা গেলে সমাজে অপরাধের হার অন্তত ৪০% থেকে ৫০% কমে যায়। কারণ, অপরাধীরা বুঝতে পারে যে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে এবং শাস্তি পেতেই হবে।
এই সফল অভিযানের বিষয়ে দর্শনা থানার ওসি নজরুল ইসলাম বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি জানান, এলাকায় চুরি, ছিনতাই বা যেকোনো ধরনের অপরাধ রোধে পুলিশের টহল আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার করা হয়েছে। আটককৃতদের আদালতের নির্দেশে ইতিমধ্যে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে অপরাধীদের আটক করে যেভাবে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি এই সহযোগিতার জন্য স্থানীয় জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও এমন সচেতনতা আশা করেন।














