শৈলকুপা হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৯ জন আনসার সদস্যের যোগদান, দালালদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এই এলাকার প্রায় আড়াই লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারি হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, চুরি এবং বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতের কারণে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। এই অরাজক পরিস্থিতি দূর করতে এবং হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তা ১০০% নিশ্চিত করতে এবার এক বড় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সরকারি উদ্যোগে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো ৯ জন সুপ্রশিক্ষিত আনসার সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছেন। তাদের এই যোগদানের ফলে সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মনে এক গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।

গত বুধবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আঙিনায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ৯ জন আনসার সদস্য তাদের নতুন কর্মস্থলে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব বুঝে নেন। এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) এবং স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা নতুন আনসার সদস্যদের তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেন। হাসপাতাল চত্বরে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে আনসার সদস্যদের বিশেষ ক্ষমতা ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে তারা পুরো হাসপাতাল পাহারা দেবেন।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, শৈলকুপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালালদের উপদ্রব ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। গ্রামের সহজ-সরল রোগীরা চিকিৎসা নিতে এলে দালালরা তাদের নানাভাবে ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে বাইরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যেত। একটি সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রাম বা রক্ত পরীক্ষার জন্য তারা রোগীদের কাছ থেকে সরকারি ফির চেয়ে প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত বেশি টাকা হাতিয়ে নিত। অনেক সময় দালালরা রোগীদের কাছ থেকে ১০থেকে১৫(ডলার) সমমূল্যের দেশীয় টাকা কমিশন হিসেবে নিয়ে যেত। এই দালাল চক্রের কারণে গরিব রোগীরা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। আনসার সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব হবে এই দালালদের চিহ্নিত করে হাসপাতাল থেকে চিরতরে বিতাড়িত করা।

দালালদের পাশাপাশি হাসপাতালের ভেতরে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ইদানীং বেশ বেড়ে গিয়েছিল। অনেক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেছেন যে, রাতে ঘুমানোর সময় তাদের মোবাইল ফোন, নগদ টাকা বা মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। এছাড়া রাতে ডিউটি করা নার্স ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তাও অনেক সময় হুমকির মুখে পড়ত। আনসার সদস্যরা এখন থেকে হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ, আউটডোর এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে কড়া নজরদারি রাখবেন। কোনো বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে হাসপাতালের ভেতরে ঘোরাফেরা করতে পারবে না।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এই নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আমাদের চিকিৎসকরা অনেক কষ্ট করে রোগীদের সেবা দেন। কিন্তু বাইরের কিছু অসাধু মানুষের কারণে হাসপাতালের সুনাম নষ্ট হচ্ছিল। আনসার সদস্যরা যোগ দেওয়ায় এখন আমরা সবাই অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছি। রোগীরা এখন কোনো ভয় ছাড়াই তাদের কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন।” তিনি আরও জানান, আনসার সদস্যদের থাকার জন্য হাসপাতালের ভেতরেই একটি নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে তারা দ্রুত সাড়া দিতে পারেন।

স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা প্রশাসনের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, একটি সরকারি হাসপাতালে সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ থাকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তবে তারা এও দাবি করেছেন যে, শুধু আনসার নিয়োগ দিলেই হবে না, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকেও মাঝে মাঝে হাসপাতালে ঝটিকা অভিযান চালাতে হবে। দালাল চক্রের মূল হোতাদের ধরে আইনের আওতায় আনলে তবেই এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান হবে। আনসার সদস্যদের এমন কঠোর প্রহরার ফলে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স খুব শিগগিরই একটি মডেল হাসপাতালে পরিণত হবে বলে সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ