আওয়ামী লীগের দাফন দিল্লিতে হয়ে গেছে, তারা আর রাজনীতি করতে পারবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ব্যাপক নৃশংসতা চালালেও তাদের মধ্যে এর জন্য কোনো অনুশোচনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন, “আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে এবং তাদের দাফন দিল্লিতে হয়ে গেছে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না।”

শনিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই আবেগঘন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ‘জুলাই ’২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ নামের দুটি সংগঠন। এই আয়োজনে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো নৃশংসতার কথা স্মরণ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এ রকম একটি ভয়ংকর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার পরেও আজ পর্যন্ত সেই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার মনে বিন্দুমাত্র কোনো অনুশোচনা নেই। তারা উল্টো জুলাই যোদ্ধাদের অপরাধী হিসেবে তকমা দিচ্ছে এবং বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানকে জঙ্গি তকমা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা দাবি করছে, বাংলাদেশে নাকি জঙ্গিবাদের মধ্য দিয়ে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে! এর চেয়ে হাস্যকর ও লজ্জাকর আর কিছু হতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, তাদের মধ্যে দোষ স্বীকারের কোনো ইতিহাসই নেই। উল্টো তারা বিদেশে বসে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র পাকানোর চেষ্টা করছে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা এবং অন্যান্য অনেক দলই রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি। বর্তমানে এর তদন্ত চলছে। ইনশা আল্লাহ, খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।” তিনি জানান, সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এখন এমন বিধান রাখা হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনেরও বিচার করা যাবে। সম্প্রতি জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাকে মাত্র ১০ বছরের সাজা দেওয়ায় বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট নয়। তার বিরুদ্ধে আরও মামলা আছে এবং আশা করা যায় সেগুলোতে তার সর্বোচ্চ সাজা হবে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্দার আড়ালের কিছু গোপন কথা অবমুক্ত করেন। তিনি বলেন, “আমি এবং আমার নেতা জনাব তারেক রহমান—আমরা দুজনই তখন নির্বাসিত ছিলাম। আল্লাহর কী অশেষ মহিমা, যদি আমরা নির্বাসিত না থাকতাম, হয়তো এই জুলাইয়ের মতো একটা অভ্যুত্থান সফলভাবে সমাপ্ত করা কখনোই সম্ভব হতো না। এটাই হচ্ছে পর্দার অন্তরালের আসল কথা।” তিনি জানান, তারা কোনো দিন শান্তিতে ঘুমাননি। ২৪ ঘণ্টা সমন্বয় করে নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করে এবং জুলাই যোদ্ধাদের সম্মুখে রেখে একটি অরাজনৈতিক পরিচয়ে আন্দোলনের একটা পর্যায় পর্যন্ত তারা নিয়ে এসেছিলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, “আজকে যাঁরা জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দাবি করেন, তাঁদের অনেকেই সেদিন বলেছিলেন যে তাঁদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নেই, শুধু কোটাবৈষম্য দূর করতে হবে। কিন্তু আমরা খুব ভালো করেই জানতাম, স্বৈরাচারকে গদিতে রেখে কোনোভাবেই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আমরা তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা রাজনৈতিকভাবে সারা বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শত-সহস্র শহীদের রক্তের স্রোতের মধ্য দিয়ে আজকে এই স্বাধীন জায়গায় এসেছি। তাই এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ে যদি কোনো বিভাজন করা হয়, তবে এই আন্দোলনের সর্ববৃহৎ অংশটি থাকবে ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা।”

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতসহ জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই বাজেটের আকার প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের ($) সমান। তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে চাইলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। শুধু ‘চাই, চাই’ করলে হবে না। সরকারের অনেক পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেই আর্থিক সামর্থ্য অর্জন করার জন্য কিছুটা সময় দিতে হবে এবং নেতৃত্বের হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।

সবশেষে জুলাই জাতীয় সম্মেলনের আয়োজক সংগঠনগুলোর উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ একটি কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, “জুলাইয়ের পবিত্র চেতনা নিয়ে যেন আমরা কেউ ব্যবসা শুরু না করি। যারা জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংগঠন খুলে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি কিন্তু ভবিষ্যতে দেখা যাবে। যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করত, তারা চেতনা বিক্রি করতে করতে আজকে দিল্লি গিয়ে বসে আছে, আর বাংলাদেশের মানুষ তাদের উৎখাত করেছে। সুতরাং চেতনা বিক্রির ব্যবসা মোটেও ভালো নয়।” তিনি সবাইকে এই মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

সম্পর্কিত নিবন্ধ