নান্দনিক ফুটবল বা ‘জোগো বনিতো’ বলতে আমরা যা বুঝি, এই ম্যাচে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে যেভাবে একটি ম্যাচ জমে ওঠে, ছিল না তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও। তারপরও বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ফ্রান্স বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচটিতে উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না। বরং একের পর এক কঠিন ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি, তর্কবিতর্ক আর একে অপরের দিকে তেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা মিলিয়ে পুরো ম্যাচজুড়েই ছড়াল এক অন্যরকম উত্তাপ। আর সেই উত্তপ্ত ও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে শেষ হাসি হেসেছে শক্তিশালী ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পের করা একমাত্র পেনাল্টি গোলে প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের জায়গা ১০০% নিশ্চিত করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।
ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচের শুরু থেকেই প্যারাগুয়ের কৌশল ছিল পরিষ্কার—‘আগে নিজেদের দরজা বন্ধ করো’। অর্থাৎ তারা রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলার নীতি বেছে নিয়েছিল। ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটে প্রায় ৯০% সময় বলের দখল ছিল ফ্রান্সের কাছে। কিন্তু এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেদের একের পর এক আক্রমণ বারবার আটকে গেছে পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে গড়া প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণে। প্রথম ২০ মিনিটে ফ্রান্সের কোনো শটই গোলপোস্টের লক্ষ্যে বা অন-টার্গেটে ছিল না।
মাঠে গোছানো ফুটবল না হলেও ম্যাচের ৩৫ মিনিটে ভিন্ন এক ঘটনায় প্রথম বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা দেয়। প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার আন্দ্রেস কুবাসের একটি কড়া ট্যাকলে এমবাপ্পে মাটিতে পড়ে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়েরা মুহূর্তের মধ্যেই ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন। রেফারি ইলগিজ তানতাশেভ বেশ কিছু সময় নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। প্রথমার্ধে গোলমুখে কোনো দলই লক্ষ্যে শট রাখতে পারেনি। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটি মাত্র তৃতীয় ম্যাচ, যেখানে বিরতির আগে কোনো দলই অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি।
বিরতির পর আক্রমণের ধার আরও বাড়ায় ফ্রান্স। ৫২ মিনিটে গোলকিপার মাইক মাইনিয়ঁর লম্বা পাসে এমবাপ্পে একাই বল নিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে দারুণ এক ট্যাকলে প্যারাগুয়েকে বিপদমুক্ত করেন হুয়ান কাসেরেস। সেই কর্নার থেকে দ্রুত খেলা শুরু করে দেম্বেলে প্রায় গোল পেয়েই গিয়েছিলেন, তবে তাঁর জোরালো শট লাগে সাইড নেটে। তিন মিনিট পর আবারও গোলের কাছাকাছি যায় ফ্রান্স, তবে কোনের দূরপাল্লার জোরালো শট কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন প্যারাগুয়ে গোলকিপার অরলান্দো গিল।
একের পর এক আক্রমণ সামলে ৬৫ মিনিট পর্যন্ত ১-০ বা গোলশূন্য সমতা ধরে রাখে প্যারাগুয়ে। এরপরই দৃশ্যপটে আসেন বদলি নামা ফরাসি তরুণ দেজিরে দুয়ে। দারুণ নৈপুণ্যে বক্সে ঢুকে পড়া দুয়েকে পেছন থেকে ফেলে দেন প্যারাগুয়ের দিয়েগো গোমেজ। রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে গেলেও ভিএআর (VAR) এর পরামর্শে সাইডলাইনে গিয়ে মনিটর দেখে সিদ্ধান্ত বদলান এবং ফ্রান্সকে পেনাল্টি উপহার দেন।
ম্যাচের ৭০ মিনিটে পাওয়া এই স্পটকিক থেকে কোনো ভুল করেননি কিলিয়ান এমবাপ্পে। শান্ত মাথায় নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে দলকে এগিয়ে নেন ফরাসি অধিনায়ক। এটি এবারের বিশ্বকাপে তাঁর সপ্তম এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ১৯তম গোল। একই সঙ্গে টানা তিন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় গোল করার দারুণ এক কীর্তিও গড়লেন এই ফরাসি তারকা। এবারের আসরে লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন এমবাপ্পে, আর বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোলসংখ্যায় মেসির (২০ গোল) ঠিক পরেই তাঁর অবস্থান।
গোল হজমের পর প্যারাগুয়ে কিছুটা ওপরে উঠে খেলার চেষ্টা করলেও ফরাসি রক্ষণে কোনো আতঙ্ক ছড়াতে পারেনি। উল্টো শেষ দিকে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পায় ফ্রান্স। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে দুয়ের পাস থেকে এমবাপ্পের পরপর দুটি শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন প্যারাগুয়ের গোলকিপার গিল। তাঁর সেই জোড়া সেভ না হলে ব্যবধান আরও বড় হতো।
ফ্রান্সের এই আক্রমণের ফাঁকেই দুই দলের খেলোয়াড়েরা ম্যাচজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে হাতাহাতিতে জড়ান। একের পর এক ট্যাকলের শিকারে বিরক্ত হয়ে ৭৭ মিনিটে কাসেরেসকে ফেলে দেন এমবাপ্পে। যোগ করা সময়ে গালারজার কড়া ট্যাকলের শিকার হওয়া ওলিসেও কিছুক্ষণ পর প্যারাগুয়ে ডিফেন্ডারকে পাল্টা ফেলে দেন। এমনকি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পরও দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ালে দ্রুত তাঁদের আলাদা করা হয়। পরিস্থিতি সামলাতে ফ্রান্স কোচ দেশমকে ম্যাচের মধ্যেই একাধিকবার দুই দলের খেলোয়াড়দের মাঝে দাঁড়িয়ে বাধা দিতে দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলেই ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করল ফ্রান্স। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ চমক দেখানো মরক্কো।














