ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই পরতে পরতে রোমাঞ্চ আর অনিশ্চয়তা। ফেভারিট দলগুলো অনেক সময় ছোট দলের কাছে হোঁচট খায়, আবার কখনো কখনো ঘাম ঝরিয়ে কোনোমতে উতরে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি স্টেডিয়ামে আজ ঠিক তেমন একটি ঘাম ঝরানো ও রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। শেষ ৩২-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে আফ্রিকান দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের মুখোমুখি হয়েছিল তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে লিওনেল মেসির দল। আর এই জয়ের মাধ্যমেই তারা বিশ্বকাপের শেষ ষোলো বা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের জায়গা ১০০% নিশ্চিত করেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে যে, তারা শুধু অংশ নিতে বিশ্বকাপে আসেনি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও মাঠে তারা আর্জেন্টিনার তারকা খেলোয়াড়দের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ২-২ গোলের সমতায় শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। অতিরিক্ত সময়ের খেলা যখন শেষের দিকে এগোচ্ছে এবং সবাই যখন টাইব্রেকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই ম্যাচের ১১১ মিনিটে ঘটে যায় এক নাটকীয় ঘটনা। কেপ ভার্দের রক্ষণভাগের এক খেলোয়াড়ের ভুলে বল সরাসরি তাদের নিজেদের জালেই জড়িয়ে যায়। এই একটি মাত্র আত্মঘাতী গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয় এবং আর্জেন্টিনা শিবির স্বস্তির এক বিশাল নিশ্বাস ফেলে। তবে যেভাবেই হোক, নকআউটের প্রথম সাঁকোটা সফলভাবে পার হয়ে গেল আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা যখন মায়ামিতে এই স্বস্তির জয় উদ্যাপন করছে, তার ঘণ্টা দুয়েক আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ কে হতে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে ম্যাচের আগে আরেক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম পরাশক্তি মিসর এবং এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি অস্ট্রেলিয়া। এই ম্যাচটিও ছিল উত্তেজনা আর নাটকীয়তায় ভরপুর। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিট মিলিয়ে ১২০ মিনিটের খেলা শেষেও দুই দল ১-১ গোলের সমতায় থাকায়, ম্যাচ গড়ায় ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্নায়ুক্ষয়ী পর্ব—টাইব্রেকার বা পেনাল্টি শুটআউটে।
টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়দের স্নায়ুর চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়ে তাদের ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে মোহাম্মদ সালাহর মিসর। মিসরের গোলরক্ষক টাইব্রেকারে দুটি চমৎকার সেভ করে দলকে এই ঐতিহাসিক জয় এনে দেন। ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এখন আর্জেন্টিনার সামনে বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে খেলা এই আফ্রিকান দলটি। মিসরের এই অসাধারণ জয় পুরো আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে এক বিশাল ফুটবল উন্মাদনার জন্ম দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার জন্য আগামী ম্যাচটি মোটেও সহজ হবে না। মিসর দলে মোহাম্মদ সালাহর মতো বিশ্বমানের ফরোয়ার্ড আছেন, যিনি একাই যেকোনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এছাড়া মিসরের রক্ষণভাগও বেশ শক্তিশালী, যা ভেদ করা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা দলে লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ এবং এনজো ফার্নান্দেজদের মতো তারকারা থাকায় মিসরকেও তাদের সেরা খেলাটাই খেলতে হবে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই দলের লড়াইয়ে যে দল মাঝমাঠের দখল রাখতে পারবে, তারাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখবে।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে প্রতিটি দলই একটি জয় পেলে কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) প্রাইজমানি পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাই কোনো দলই মাঠে এক ইঞ্চি জায়গাও বিনা লড়াইয়ে ছাড়বে না। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা দলের বিশাল এক সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। মায়ামির জয়টি কষ্টার্জিত হলেও, বাংলাদেশের দর্শকরা এখন থেকেই শেষ ষোলোর এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। আর্জেন্টিনা বনাম মিসরের এই হাইভোল্টেজ শেষ ষোলোর ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৭ জুলাই (মঙ্গলবার)। বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী রাত ঠিক ১০টায় শুরু হবে এই মহারণ। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই ম্যাচটি যে দারুণ এক বিনোদনের খোরাক হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।














