ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এই অঞ্চলের হাজারো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অসহায় ও গরিব রোগীরা এখানে আসেন একটু ভালো চিকিৎসা আর কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশায়। কিন্তু সরকারি এই হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল এক প্রকার ‘ওপেন সিক্রেট’। সম্প্রতি হাসপাতাল প্রশাসনের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী সিদ্ধান্তে সেই দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র সবার সামনে উঠে এসেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগের কাউন্টার পৃথক করার পর মাত্র ১৩ কর্মদিবসে যে পরিমাণ টাকা আয় হয়েছে, তা অতীতের তিন মাসের আয়ের সমান! এই চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশের পর পুরো উপজেলাজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। শৈলকুপার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সচেতন প্রবাসীরা আজ চরম ক্ষুব্ধ হয়ে একটিই যৌক্তিক প্রশ্ন করছেন এতদিন এই প্যাথলজি বিভাগের লাখ লাখ টাকা কার পকেটে ঢুকেছে?
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান ও সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা
আমাদের দেশের সাধারণ গরিব মানুষের প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দামি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সামর্থ্য নেই। তাই তারা বাধ্য হয়েই সরকারি হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের ওপর নির্ভর করেন। রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম থেকে শুরু করে নানা ধরনের প্রয়োজনীয় টেস্ট সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে করা যায়। শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও প্রতিদিন শত শত রোগী আসেন এই সেবা নিতে। কিন্তু রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও সেই টাকা কি সঠিকভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছিল? সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, সাধারণ মানুষের আস্থার এই জায়গাটিতে দিনের পর দিন কতটা নির্লজ্জভাবে সরকারি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
প্যাথলজি বিভাগের কাউন্টার পৃথকীকরণের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালের টিকিট কাউন্টার এবং প্যাথলজি সেবার টাকা হয়তো একই জায়গা থেকে বা চরম অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নেওয়া হতো। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিত একটি বিশেষ অসাধু চক্র। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন বা নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যখন বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন, তখন তারা হাসপাতালে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার সাহসী উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে প্যাথলজি বিভাগের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি কাউন্টার স্থাপন করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল, কতজন রোগী প্রতিদিন পরীক্ষা করাচ্ছেন এবং কত টাকা আয় হচ্ছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট ও সঠিক হিসাব রাখা। এই একটি মাত্র যুগান্তকারী সিদ্ধান্তেই যেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে।
১৩ কর্মদিবসে আয়ের অবিশ্বাস্য লাফ ও দুর্নীতির প্রমাণ
আলাদা কাউন্টার চালু হওয়ার পর যে হিসাব সামনে এসেছে, তা রীতিমতো পিলে চমকানোর মতো। মাত্র ১৩ কর্মদিবসে প্যাথলজি বিভাগ থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে, তা বিগত সময়ের পুরো তিন মাসের আয়ের সমান! এই হিসাব কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এটি দুর্নীতির এক জ্বলন্ত ও গাণিতিক প্রমাণ। অর্থাৎ, আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ টাকা রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হতো, তার একটি বিশাল অংশ গায়েব হয়ে যেত। ১৩ দিনেই যদি তিন মাসের সমপরিমাণ টাকা উঠে আসে, তাহলে বিগত বছরগুলোতে কত কোটি টাকা এই খাত থেকে লুটপাট হয়েছে, তা কল্পনা করলেও সাধারণ মানুষের গা শিউরে ওঠে।
এতদিন টাকাগুলো কোথায় যেত এবং কার পকেটে ঢুকেছে?
শৈলকুপাবাসী ও প্রবাসীদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন এতদিন এই লাখ লাখ টাকাগুলো গেল কোথায়? কার পকেটে ঢুকেছে সাধারণ মানুষের কষ্টের এই টাকা? সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে এই টাকা নিশ্চয়ই বাতাসে মিলিয়ে যায়নি। এর পেছনে অবশ্যই হাসপাতালের ভেতরের কোনো শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। রোগীদের কাছ থেকে পুরো টাকা নেওয়া হলেও হয়তো ভুয়া রসিদ দেওয়া হতো, অথবা খাতায় রোগীর সংখ্যা কম দেখিয়ে বাকি টাকা নিজেদের পকেটে পুরত এই অসাধু চক্রটি। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে চলা এই হরিলুট একা কারও পক্ষে করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর সাথে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ
সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু দালালরা কখনোই হাসপাতালের ভেতরের অসাধু কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় দুর্নীতি দিনের পর দিন চালিয়ে যেতে পারে না। শৈলকুপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই প্যাথলজি দুর্নীতির পেছনেও ভেতরের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মীর সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে বলে সচেতন মহল মনে করেন। তারা নিজেদের পকেট ভারী করতে গিয়ে একদিকে যেমন সরকারকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছেন, অন্যদিকে গরিব রোগীদের ইমোশন নিয়েও প্রতারণা করেছেন। এই চক্রটি এতই বেপরোয়া ছিল যে, তারা সরকারি হিসাবের খাতায় দিনের পর দিন গরমিল করে পার পেয়ে গেছে।
জবাবদিহিতা ও সুষ্ঠু তদন্তের জোরালো দাবি
মাত্র ১৩ দিনে তিন মাসের আয়ের সমান টাকা জমা হওয়ার এই ঘটনাটি কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। শৈলকুপার সাধারণ মানুষ এবং প্রবাসীরা আজ একজোট হয়ে এর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছেন। অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে বিগত কয়েক বছরের প্যাথলজি বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা (অডিট) করতে হবে। যারা এই ভয়ংকর দুর্নীতির সাথে জড়িত, তারা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। চুরি যাওয়া সরকারি টাকা উদ্ধার করে তা হাসপাতালের উন্নয়নের কাজেই লাগাতে হবে। অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে এমন দুর্নীতির সাহস অন্যদেরও আরও বেড়ে যাবে।
ডিজিটাল সেবা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা
দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ করতে হলে সনাতন পদ্ধতির হিসাব-নিকাশ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্যাথলজি বিভাগসহ হাসপাতালের প্রতিটি সেবায় ডিজিটাল বিলিং সিস্টেম বা কম্পিউটারাইজড ই-রসিদ চালু করা এখন সময়ের দাবি। কাউন্টারগুলোতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে এবং প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের হিসাব অনলাইনে আপডেট করার ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সরকারি হাসপাতালে এমন হরিলুট পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব।
উপসংহার
শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগের কাউন্টার পৃথক করার পর যে নির্মম সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের একটি রূঢ় বাস্তবতা। গরিবের চিকিৎসার টাকা যারা চুরি করে নিজেদের পকেটে ভরেছে, তারা সমাজের সবচেয়ে বড় অপরাধী ও মানবতাবিরোধী। কাউন্টার পৃথক করার এই সৎ ও সাহসী উদ্যোগের জন্য বর্তমান হাসপাতাল প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে সাধুবাদ জানাই। তবে শুধু কাউন্টার আলাদা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; অতীতের দুর্নীতির হিসাবও কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে হবে। শৈলকুপাবাসী ও প্রবাসীদের সেই ন্যায্য প্রশ্ন “টাকা কার পকেটে ঢুকেছে?”এর সুস্পষ্ট উত্তর দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে প্রশাসনকেই। আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চাই, যেখানে সেবার নামে সাধারণ মানুষের রক্ত চোষা কোনো হরিলুট থাকবে না।














