সরকারি প্রকল্পের টাকা কীভাবে পুকুর চুরি হয় এবং সেই চুরির খবর প্রকাশ করলে একজন সাংবাদিককে কতটা বিপদের মুখে পড়তে হয়, তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া গেল কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায়। টিআর (টেস্ট রিলিফ) বা কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্পের আওতায় একটি ঢালাই রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন স্থানীয় সাংবাদিক রিয়াজুল ইসলাম রুহী। কিন্তু এই সাহসী কাজের জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্তদের দ্বারা তিনি বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন। শুধু মারধর করেই তারা শান্ত হয়নি, বরং তার দামি স্মার্টফোন ও মানিব্যাগও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। হামলায় গুরুতর আহত ওই সাংবাদিক বর্তমানে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত একটি গ্রামীণ রাস্তার নির্মাণকাজ নিয়ে। গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে সাংবাদিক রিয়াজুল ইসলাম রুহী বেরুবাড়ী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মিরারভিটা গ্রামে যান। সেখানে টিআর/কাবিখা প্রকল্পের আওতায় একটি ঢালাই রাস্তার নির্মাণকাজ চলছিল। স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাকে জানান যে, রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি সরেজমিনে গিয়ে দেখেন, সরকারি প্রকল্পের কাগজপত্র অনুযায়ী ওই রাস্তার দৈর্ঘ্য ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ ১০ ফুট হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদার ও মেম্বার মিলে রাস্তার প্রস্থ প্রায় ৮ ফুট বা ২০% কমিয়েছেন। এছাড়া ঢালাই কাজে ভালো ইটের বদলে একেবারে নিম্নমানের ৩ নম্বর ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অনিয়ম ক্যামেরায় ধারণ করে রাত আনুমানিক ৮টার দিকে তিনি একটি ভিডিও সংবাদ প্রকাশ করেন।
সাংবাদিক রিয়াজুল ইসলাম রুহী পেশায় দৈনিক সরেজমিন পত্রিকার নাগেশ্বরী উপজেলা প্রতিনিধি এবং ‘আপডেট নিউজ নাগেশ্বরী’ নামের একটি জনপ্রিয় ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন। তিনি মূলত ওই ফেসবুক পেজ থেকেই ভিডিও সংবাদটি প্রকাশ করেছিলেন। ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথেই তা স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। কিন্তু সত্য প্রকাশের এই সাহস ভালো চোখে নেননি অভিযুক্তরা। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, ভিডিও সংবাদ প্রকাশের মাত্র দুই ঘণ্টা পর, অর্থাৎ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বেরুবাড়ী বাজার এলাকায় তিনি একা ছিলেন। ঠিক তখনই ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) আশরাফুল আলম এবং তার ভাই আতাউর রহমান তার ওপর অতর্কিত হামলা চালান।
হামলাকারীরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিক রুহীকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। এই বর্বরোচিত হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ভুক্তভোগী রুহী আরও অভিযোগ করেন যে, মারধরের একপর্যায়ে হামলাকারীরা তার কাছে থাকা প্রায় ৫৫ হাজার টাকা বা ৫০০$ (ডলার) মূল্যের একটি স্যামসাং ব্র্যান্ডের দামি স্মার্টফোন জোর করে ছিনিয়ে নেন। শুধু স্মার্টফোনই নয়, তার পকেটে থাকা নগদ টাকাসহ মানিব্যাগটিও তারা লুট করে নিয়ে যান। মূলত ওই মোবাইল ফোনে দুর্নীতির আরও কিছু প্রমাণ ছিল বলেই তারা ফোনটি ছিনিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আশরাফুল আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন অন্য সাংবাদিকরা। কিন্তু তার ফোনটি টানা বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনার পর থেকেই তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন। ফলে এই হামলার বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য বা আত্মপক্ষ সমর্থন শোনা সম্ভব হয়নি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, দুর্নীতির খবর প্রকাশ হওয়াতেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আমাদের দেশে মফস্বল বা গ্রাম পর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকরা সব সময়ই এমন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% দুর্নীতির খবর মূলত এই তৃণমূলের সাংবাদিকরাই তুলে আনেন। কিন্তু তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে খবর করলেই তাদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয় অথবা এভাবে শারীরিক হামলা করা হয়। সাংবাদিক রুহীর ওপর এই হামলার ঘটনায় নাগেশ্বরী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এ বিষয়ে নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ হীল জামান সাংবাদিকদের জানান, “আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় কুড়িগ্রাম জেলার স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তারা এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সাংবাদিক নেতারা দাবি করেছেন, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষী ইউপি সদস্য ও তার ভাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসন যদি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের প্রশ্রয় দেয়, তবে সমাজ থেকে সত্য ও ন্যায়বিচার চিরতরে হারিয়ে যাবে।














