গাইবান্ধায় মাদকের বলি দাদি: নাতির ছুরিকাঘাতে নিহত, দাদা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাদকের নেশা মানুষকে কতটা অন্ধ ও পশুর মতো নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে, তার এক ভয়ংকর ও মর্মান্তিক প্রমাণ দেখল গাইবান্ধাবাসী। সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে নিজের আপন নাতির ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা দাদি। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তার স্বামী। বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার খামার পবন তাইড় গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা।

নিহত ওই বৃদ্ধার নাম ফেরেজা বেগম (৬৫)। আর গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তার স্বামী আব্দুল করিম। এই জঘন্য ও অমানবিক হামলার মূল অভিযুক্ত শাকিল (১৯), যে কিনা ওই দম্পতির নিজের আপন নাতি এবং তাদের ছেলে রফিকুল ইসলামের সন্তান। মাত্র ১৯ বছর বয়সে একজন তরুণের এমন নৃশংস হয়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে মাদককেই দায়ী করছেন সবাই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া এই মাদক কীভাবে একটি সাজানো গোছানো পরিবারকে এক নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে ঘটনার পেছনের আসল কারণ জানা গেছে। তারা জানান, শাকিল দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের ভয়ংকর মাদকে আসক্ত ছিল। সে প্রতিদিন মাদক সেবনের জন্য টাকার সন্ধানে পরিবারের সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করত। তার এই মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবন ও উশৃঙ্খল আচরণের কারণে বেশ কিছুদিন আগে তার স্ত্রী অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে নিজের বাবার বাড়িতে চলে যান। বুধবার দুপুরে স্ত্রীকে কীভাবে বাবার বাড়ি থেকে ফিরিয়ে আনা যায়, তা নিয়েই দাদা-দাদির সঙ্গে শাকিলের কথা কাটাকাটি শুরু হয়। দাদা-দাদি তাকে মাদক ছেড়ে ভালো পথে আসার পরামর্শ দিচ্ছিলেন, কিন্তু নেশায় বুঁদ থাকা শাকিল কোনো কথাই শুনতে রাজি ছিল না।

কথায় কথায় তর্ক যখন চরমে পৌঁছায়, তখন শাকিল হঠাৎ করে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে ঘরে থাকা একটি ধারালো অস্ত্র বা ছুরি নিয়ে নিজের বৃদ্ধ দাদা ও দাদির ওপর এলোপাতাড়ি আঘাত করতে শুরু করে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই দুই বৃদ্ধ মানুষ নাতির এমন আকস্মিক ও পাশবিক হামলার সামনে ১০০% অসহায় হয়ে পড়েন। ছুরিকাঘাতে দুজনের শরীর থেকেই প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং তারা রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তাদের আত্মচিৎকার শুনে আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে আসেন এবং হতভম্ব হয়ে যান। স্থানীয় লোকজন সাহসিকতার সাথে শাকিলকে ধরে ফেলেন এবং তাকে শক্ত করে বেঁধে রেখে সাঘাটা থানা পুলিশকে খবর দেন।

খবর পাওয়ার পরপরই সাঘাটা থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং অভিযুক্ত শাকিলকে তাদের হেফাজতে নিয়ে থানায় চলে যায়। এদিকে স্থানীয়রা একটুও সময় নষ্ট না করে রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় আব্দুল করিম ও ফেরেজা বেগমকে উদ্ধার করে সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। কিন্তু তাদের শরীরের আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, চিকিৎসকরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকায় চিকিৎসকরা তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বগুড়া হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ফেরেজা বেগম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আর তার স্বামী আব্দুল করিম এখন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। আমাদের সমাজে মাদকের বিস্তার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররাও এর শিকার হচ্ছে। একটি ইয়াবা ট্যাবলেট হয়তো বাজারে ২বা৩(ডলার) মূল্যে বিক্রি হয়, কিন্তু এর কারণে একটি পরিবারকে পরে চিকিৎসার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের রিহ্যাব বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে গিয়ে আর্থিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

এই জঘন্য ও মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো খামার পবন তাইড় গ্রামে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গ্রামের মানুষ এমন নৃশংসতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। সাঘাটা থানার পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত শাকিলকে থানায় কঠোর পাহারায় রাখা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ এই ঘটনার পেছনে মাদকের পাশাপাশি অন্য কোনো ইন্ধন আছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখছে। এলাকার মানুষ প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, তারা যেন শুধু শাকিলকেই নয়, বরং তাকে যারা মাদক সরবরাহ করত, সেই মূল মাদক কারবারিদেরও দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ