আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় বর্তমানে এক ভয়ংকর সংকট দেখা দিয়েছে। দেশে আশঙ্কাজনক হারে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা নিবিড় পরিচর্যাসেবার (আইসিইউ) তীব্র সংকট বাড়ছে বলে জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ও দেশের বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি তথ্য তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড বা আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭টি। আর সাধারণ শয্যা রয়েছে মাত্র ৯টি। সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো, দেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৮টি জেলাতেই মুমূর্ষু রোগীদের জন্য কোনো ধরনের আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র নেই।
আজ বুধবার রাজধানীর অভিজাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের (বিএসসিসিএম) জাতীয় সম্মেলন ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ডা. জুবাইদা রহমান দেশের স্বাস্থ্য খাতের এই করুণ ও বাস্তব চিত্র সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশে যে সামান্য কিছু আইসিইউ সুবিধা রয়েছে, তারও প্রায় ৮০% থেকে ৯০% শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। এর ফলে ঢাকার বাইরের সাধারণ মানুষ জরুরি মুহূর্তে এই জীবনরক্ষাকারী সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, “আমাদের দেশের প্রায় ৬৮% থেকে ৭০% সাধারণ মানুষ গ্রামে বাস করেন। কিন্তু ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটগুলো মূলত বড় বড় শহরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করে রাখা হয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো নবজাতক শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মা, নিউমোনিয়া বা স্ট্রোকে আক্রান্ত কোনো বয়স্ক মানুষ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিরা সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।” একটি আইসিইউ শয্যার অভাবে চোখের সামনে রোগীর মৃত্যু দেখাটা যেকোনো পরিবারের জন্যই চরম কষ্টের। অনেক সময় বেসরকারি হাসপাতালে একটি আইসিইউ বেডের জন্য প্রতিদিন প্রায় ২০০থেকে৩০০(ডলার) বা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়, যা গরিব মানুষের পক্ষে জোগাড় করা ১০০% অসম্ভব।
সংকটের আরও গভীরে গিয়ে ডা. জুবাইদা রহমান জানান, দেশে শুধু আইসিইউ শয্যারই অভাব নেই, বরং এই শয্যাগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যেমন অ্যানেসথেটিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট এবং নিউরোলজিস্টেরও তীব্র সংকট রয়েছে। এছাড়া আইসিইউতে কাজ করার মতো দক্ষ নার্স এবং বিশেষায়িত আধুনিক যন্ত্রপাতিরও বড় ধরনের অভাব রয়েছে। আমাদের দেশের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও এই করুণ পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হলে এখন থেকেই সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে তিনি আহ্বান জানান।
উন্নত অ্যাম্বুলেন্স সেবার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের এই সহসভাপতি। তিনি বলেন, “গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য হাসপাতাল থেকে গ্রামের দূরত্ব এবং সঠিক যানবাহন না পাওয়া একটি বড় অন্তরায়। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে হয়তো তাৎক্ষণিক আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে রোগীদের খুব দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে আনা ১০০% সম্ভব। তাই প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে দ্রুত একটি করে পূর্ণাঙ্গ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”
এত সব সীমাবদ্ধতা ও সংকটের মাঝেও দেশের চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সেবার মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, “হাসপাতালগুলোতে সুষ্ঠু ব্যবস্থার অনেক অভাব থাকা সত্ত্বেও আমাদের চিকিৎসক ও নার্স ভাইবোনেরা দিনরাত পরিশ্রম করে রোগীদের সুস্থ করে তুলছেন। তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক অসহায় পরিবারের আশার আলো বাঁচিয়ে রাখছেন।” একটি মৃত্যু যেন কোনো পরিবারকে আর্থিকভাবে পুরোপুরি সর্বস্বান্ত না করে দেয়, সে জন্য ভবিষ্যতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিবিড় পরিচর্যাসেবার পরিধি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জোরালো তাগিদ দেন তিনি।
এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্মেলনে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী অন্যতম। এছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এফ এম সিদ্দিকী, বিএসসিসিএমের সভাপতি অধ্যাপক আরিফ আহসান ও সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর ইকবাল, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ ও মহাসচিব জহিরুল ইসলাম শাকিল এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।














