আজ বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে একযোগে শুরু হচ্ছে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। তবে পরীক্ষার আগেই একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬% শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। প্রতিবছরই এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন করার পরও শেষ পর্যন্ত আর পরীক্ষার হলে আসেন না। কিন্তু এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া বা ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর এই হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু দুই বছর পর, এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য চূড়ান্ত ফরম পূরণ করেছেন মাত্র সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। এর মানে হলো, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় বসছেন না। গত বছর এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা না দেওয়ার এই হার ছিল ২৯% এর কিছু বেশি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই ঝরে পড়ার হার প্রায় ৭% বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র সবচেয়ে বেশি হতাশাজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪% এর বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি। অন্যদিকে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করলেও, তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন বা ৩৩% শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেও এই হার বেশ চড়া। সেখানে আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধন করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪৪% বা ৬১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেননি।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন পড়াশোনা ছেড়ে দিলেন বা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না, তার কোনো ১০০% সুনির্দিষ্ট কারণ শিক্ষা বিভাগ এখনো জানাতে পারেনি। তবে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের করা একটি ছোট গবেষণায় এর কিছু কারণ উঠে এসেছিল। ওই বছর ঢাকা বোর্ডের অধীনে অনুপস্থিত ১ হাজার ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে প্রায় ৪১% শিক্ষার্থীর ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাল্যবিবাহই ছিল ছাত্রীদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। এছাড়া পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতির অভাব এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে অনেক ছাত্রকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমে পড়তে হয়।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, শিক্ষার্থীরা কেন ঝরে পড়ছে, সেই দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করা হচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় নির্ধারিত বছরে পরীক্ষায় অংশ নেয় না এবং পরের বছর আবার পরীক্ষায় বসে। এটিও অনুপস্থিতির একটি বড় কারণ হতে পারে।
এদিকে আজ থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। সারা দেশে মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। পরীক্ষার হলে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম এড়াতে কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে এবার বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে। আগামী ২১ দিনের মধ্যে লিখিত পরীক্ষা শেষ হবে। যেসব দিন পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ক্লাস চলবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এবার দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন বা একই প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বিষয়গুলোও (যেমন বাংলা ও ইংরেজি) অভিন্ন প্রশ্নপত্রে নেওয়া হবে। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ যদি কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভুয়া খবর ছড়ায়, তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক উপস্থিত ছিলেন।














