যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি: অর্থ ছাড় নিয়ে দোহায় আলোচনা, তবে বৈঠক নিয়ে ধোঁয়াশা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতা ও যুদ্ধ বন্ধে গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। সেই চুক্তির পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে এবং বাস্তব রূপ দিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল গতকাল মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছেছে। তবে এই সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এক অদ্ভুত ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তেহরান খুব স্পষ্ট ভাষায় বলছে, কাতারের ব্যাংকে আটকে থাকা তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেই তাদের আলোচক দল দোহা গেছে। ওয়াশিংটনের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক এখনো নির্ধারিত নেই। এর আগে গত সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে এই নাজুক অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ইতিমধ্যে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবশ্য ভিন্ন কথা বলা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আলোচনার জন্য তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে দোহায় পাঠাচ্ছেন। অন্যদিকে ইরান তাদের একটি কারিগরি প্রতিনিধিদল কাতারে পাঠালেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, এর সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফরের কোনো সম্পর্ক নেই। দুই পক্ষ আদৌ মুখোমুখি বৈঠকে বসবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হওয়া এই মতবিরোধ গত ১৭ জুনের চুক্তির অত্যন্ত নাজুক দিকটিকে বিশ্ববাসীর সামনে এনেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত করা এই সংঘাত থামানোর লক্ষ্যেই মূলত চুক্তিটি হয়েছিল। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস নির্বাচন, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি চাইছেন যেকোনো মূল্যে এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন।

গত এপ্রিলে হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে অন্তত ৬০ দিন সময় নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কিন্তু সেই অগ্রগতি এখন অনেকটাই থমকে গেছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে বারবার চুক্তি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই এই পথ বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দোহায় একটি বৈঠক হবে। তবে সুইজারল্যান্ডে ইরান ও মার্কিন দলের মধ্যকার আগের কারিগরি আলোচনার মতো এটি সরাসরি হবে না। এবারের মূল ফোকাস বা লক্ষ্য থাকবে হরমুজ প্রণালির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের ওপর। সফর পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত আরেক কর্মকর্তা জানান, বুধবার কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কারিগরি দলগুলো।

এই পুরো বিষয়টি নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনেও চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘দোহায় এই বৈঠকটি হয়তো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। আমরা অপেক্ষা করে তা দেখতে পাব।’ ট্রাম্পের এই কথার পর অনেকেই ধারণা করছেন, আলোচনা খুব একটা এগোচ্ছে না। প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে অংশীদারত্বে থাকা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করে ইরান মূলত আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। তেহরান ইতিমধ্যে জানিয়েছে, তারা এই নৌপথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফি বা টোল নেওয়ার পরিকল্পনা করছে এবং তাদের নির্ধারিত পথের বাইরে যাওয়া জাহাজগুলোর চলাচলে কঠোরভাবে বাধা দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর কড়া জবাবে মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় সরাসরি বোমা হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরানও বসে থাকেনি। গত রোববার ভোরে তারা কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সোমবার মার্কিন আইনপ্রণেতাদের ইরান পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে ব্রিফ করেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য চাক শুমার সরকারের এই পদক্ষেপকে ত্রুটিপূর্ণ বলে সমালোচনা করেছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানিয়েছেন, কাতারে জব্দ থাকা তাদের ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদের মধ্যে ৬০০ কোটি ডলার বা ৬ বিলিয়ন ডলার ($) খুব শিগগিরই ছাড়া হবে এবং তা ইরানে ফেরত আসবে। তিনি এই সমঝোতা স্মারককে ইরানের জনগণের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেন। এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সোমবার বলেছেন, তিনি উত্তেজনা প্রশমণে ওমানের সঙ্গে কাজ করছেন এবং হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণে অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে এর কড়া জবাবে বলেন, ১৪ দফার পরিকল্পনা অনুযায়ী মাইন অপসারণের কাজ শুধু ইরান একাই করবে, সেখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ