পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হয়তো তাকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হলো, অথবা জন্মের পরপরই কেউ তাকে নিষ্ঠুরভাবে ছুড়ে ফেলেছে নদীর স্রোতে। এমন এক অমানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলায়। উপজেলার হোগলা ইউনিয়নের কালিহরকান্দা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালিহর নদী থেকে একটি ফুটফুটে নবজাতক কন্যাশিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ফুটফুটে এই শিশুটির এমন করুণ পরিণতি দেখে গ্রামের সাধারণ মানুষের চোখে জল চলে আসে। কে বা কারা এমন নিষ্ঠুর কাজ করেছে, তা নিয়ে পুরো এলাকায় এখন ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার শুরু আজ সকালে। প্রতিদিনের মতোই গ্রামের সাধারণ মানুষ নদীর পাড়ে তাদের দৈনন্দিন কাজ করছিলেন। হঠাৎ করেই তাদের চোখে পড়ে নদীর পানিতে কালো কাপড়ে মোড়ানো একটি সন্দেহজনক বস্তু ভাসছে। কাছে গিয়ে তারা দেখতে পান, সেটি আসলে একটি নবজাতকের মৃতদেহ। এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পূর্বধলা থানা পুলিশকে খবর দেন। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিবুর রহমান পিপিএম এবং সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নদীর পানি থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার করে। লাশটি উদ্ধার করার পর এর অবস্থা দেখে উপস্থিত সবাই রীতিমতো শিউরে ওঠেন। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মৃত নবজাতক কন্যাশিশুটিকে একটি কালো রঙের টি-শার্ট দিয়ে খুব শক্ত করে প্যাঁচানো হয়েছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, লাশটি যাতে পানির ওপরে ভাসতে না পারে এবং মানুষের চোখে না পড়ে, সেজন্য একটি লাল রঙের রশি দিয়ে এর সাথে একটি ভারী ইট বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ইটসহ শিশুটিকে নদীর পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনোভাবে রশি আলগা হয়ে যাওয়ায় বা পানির প্রবল স্রোতে লাশটি ভেসে ওঠে।
আমাদের সমাজে এমন নবজাতক ফেলে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়, তবে ইট বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়ার মতো এমন নিষ্ঠুরতা খুব কমই দেখা যায়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, অবৈধ সম্পর্ক এবং সামাজিক লজ্জার ভয়েই সাধারণত এমন নির্মম কাজগুলো ঘটে থাকে। অনেক সময় অভাবের তাড়নায় বা কন্যাশিশু হওয়ার কারণেও কিছু পাষণ্ড মা-বাবা এমন জঘন্য পথ বেছে নেয়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর দেশে এমন শত শত নবজাতক ডাস্টবিন, ঝোপঝাড় বা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, যাদের প্রায় ৯০% শিশুই শেষ পর্যন্ত বাঁচে না। এই ধরনের অপরাধ প্রমাণ হলে প্রচলিত আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ফাঁসির বিধান রয়েছে।
পূর্বধলা থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এই মর্মান্তিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে আমাদের পুলিশ সদস্যরা দ্রুত নদী থেকে নবজাতকের মৃতদেহটি উদ্ধার করেছে। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। শিশুটি জন্মের আগেই মারা গিয়েছিল নাকি তাকে হত্যার পর পানিতে ফেলা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ময়নাতদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তাই ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহটি নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ওসি আরও জানান, পুলিশ এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। কে বা কারা এই নবজাতককে নদীতে ফেলে গেছে, তাদের খুঁজে বের করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ শুরু করেছে। আশপাশের গ্রামগুলোতে কোনো নারী সম্প্রতি গর্ভবতী ছিলেন কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেউ যদি এই বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য দিয়ে পুলিশকে সাহায্য করতে পারে, তবে তার পরিচয় ১০০% গোপন রাখা হবে বলে পুলিশ সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছে।
কালিহরকান্দা গ্রামের সাধারণ মানুষ এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বয়স্করা বলছেন, এমন নিষ্ঠুরতা সমাজের জন্য এক চরম অশনিসংকেত। একটি নিষ্পাপ শিশুর সাথে এমন আচরণ কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না। এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজকে বদলাতে হলে আমাদের মানসিকতা ও নৈতিক শিক্ষার ওপর আরও অনেক বেশি জোর দিতে হবে। এখন শুধু দেখার বিষয়, পুলিশ কত দ্রুত এই নিষ্ঠুরতার আসল রহস্য উদঘাটন করতে পারে।














