নরসিংদীতে এএসআই নিয়োগের শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন: দালাল থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান এসপির

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি করার স্বপ্ন দেখেন দেশের লাখ লাখ তরুণ-তরুণী। সমাজের মানুষের সেবা করার পাশাপাশি একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী সরকারি পেশা হিসেবে পুলিশের চাকরি সব সময়ই তরুণ প্রজন্মের কাছে ১০০% আকর্ষণীয়। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এবার বাংলাদেশ পুলিশে ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র) পদে নিয়োগ-২০২৬ এর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সারা দেশের মতো নরসিংদী জেলাতেও অত্যন্ত উৎসবমুখর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে এই নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। রোববার (২৮ জুন) নরসিংদী জেলা পুলিশ লাইন্স মাঠে এই নিয়োগের দ্বিতীয় দিনের শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা বা ফিজিক্যাল এন্ডিওরেন্স টেস্ট (PET) অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

রোববার সকাল থেকেই নরসিংদী পুলিশ লাইন্স মাঠে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। সবার চোখেমুখেই ছিল পুলিশে যোগ দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা এবং শারীরিক পরীক্ষায় টিকে থাকার এক অন্যরকম জেদ। দ্বিতীয় দিনের এই শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষায় মূলত প্রার্থীদের শারীরিক ফিটনেস এবং স্ট্যামিনা বা সহ্যক্ষমতা যাচাই করা হয়। এদিন প্রার্থীদের জন্য ১,৬০০ মিটার বা প্রায় এক মাইলের একটি লম্বা দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই দৌড় শেষ করাটা প্রার্থীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। দৌড়ের পাশাপাশি প্রার্থীদের লং জাম্প বা দীর্ঘ লাফ এবং হাই জাম্প বা উচ্চ লম্ফ পরীক্ষাও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নেওয়া হয়।

এই বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করার জন্য মাঠে উপস্থিত ছিলেন নরসিংদী জেলার নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ও জেলার সুযোগ্য পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ্-আল-ফারুক। শুধু জেলা পুলিশই নয়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন শতভাগ স্বচ্ছ হয়, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বা পুলিশ সদর দপ্তরের একজন প্রতিনিধিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি হলেন বিশেষ পুলিশ সুপার (এসবি), ঢাকা এম এম মাহমুদ হাসান, পিপিএম (বার), পিএসসি। এছাড়া নরসিংদী জেলা পুলিশের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরা সারাদিন মাঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই শারীরিক পরীক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

পরীক্ষা চলাকালীন পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ্-আল-ফারুক মাঠে উপস্থিত চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণী এবং তাদের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত কড়া ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশ পুলিশে এবার ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র) পদে যে নিয়োগ হবে, তা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত হবে। মেধা ও শারীরিক যোগ্যতার বাইরে অন্য কোনো উপায়ে বা তদবির করে পুলিশের চাকরি পাওয়ার কোনো সুযোগ এখন আর নেই। তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান পুলিশ প্রশাসন যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা ০% ছাড় দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।

আমাদের দেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দালাল ও প্রতারক চক্রের একটি বড় দৌরাত্ম্য সব সময়ই দেখা যায়। অনেক সময় দালালরা সাধারণ গ্রামের মানুষদের পুলিশের চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ৪,০০০থেকে৮,০০০(ডলার) এর সমান। গরিব মানুষ জমি বিক্রি করে বা সুদে ঋণ নিয়ে এই টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে পরে সর্বস্বান্ত হয়। এই বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপার প্রার্থীদের বিশেষভাবে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, “কোনো দালাল বা প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দেবেন না। কেউ যদি টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলে, তবে সাথে সাথে পুলিশকে জানাবেন। শুধু আপনার যোগ্যতাই আপনাকে এই চাকরি এনে দিতে পারে।”

রোববারের এই দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষায় যারা সফলভাবে ১,৬০০ মিটার দৌড়, লং জাম্প ও হাই জাম্প শেষ করে উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদের জন্য সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। আগামী ২৯ জুন সোমবার তাদের শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষার পরবর্তী ও চূড়ান্ত ধাপে অংশ নিতে হবে। এই ধাপে প্রার্থীদের শরীরের পেশির শক্তি যাচাই করার জন্য পুশ-আপ, সিট-আপ, ড্র্যাগিং বা ভারী বস্তু টানা এবং রোপ ক্লাইম্বিং বা দড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার মতো অত্যন্ত কঠিন সব পরীক্ষা দিতে হবে। এই সব শারীরিক পরীক্ষায় যারা ১০০% ফিট বলে প্রমাণিত হবেন, কেবল তারাই পরবর্তী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হবেন।

বাংলাদেশ পুলিশে এমন স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া দেশের সাধারণ ও মেধাবী তরুণদের মনে নতুন করে বিশাল আশার সঞ্চার করেছে। অভিভাবকরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, টাকা বা মামা-চাচার জোর না থাকলেও শুধু নিজের শারীরিক ফিটনেস ও মেধার জোরে এখন পুলিশের চাকরি পাওয়া সম্ভব। নরসিংদী জেলা পুলিশ লাইন্স মাঠে আসা প্রার্থীরা জানান, মাঠে তাদের সাথে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করা হয়েছে এবং পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সবার সামনে খুব পরিষ্কারভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। আগামী দিনের পুলিশ বাহিনী যে আরও বেশি আধুনিক, ফিট এবং জনবান্ধব হবে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া তারই একটি বড় প্রমাণ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ