‘মা, আমি আইছি’—এই ডাক আর শুনবেন না জাহানারা বেগম, ইতালিতে ছেলেসহ তিনজনকে হত্যা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বিজয়নগর গ্রামের একটি সাধারণ কৃষক পরিবার। এই পরিবারের প্রায় ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা জাহানারা বেগমের সংসারে এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। একমাত্র ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুলকে ঘিরেই ছিল তার সব স্বপ্ন, নির্ভরতা আর শেষ বয়সে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু ইতালির রাজধানী রোমে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের অবুঝ মেয়েসহ নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন বাবুল। অথচ বৃদ্ধা মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তার কাছে এখনো সেই নির্মম সত্যটি গোপন রাখা হয়েছে। একটি সাজানো গোছানো পরিবার কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল, তা ভেবে গ্রামের মানুষ হতবাক।

শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে বাবুলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো পরিবার। ঘরের এক কোণে বসে বিলাপ করছেন বৃদ্ধা মা জাহানারা বেগম। তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বারবার শুধু একটি কথাই বলছেন, “আমার বাবুল আবার আইবো, আমার বাবুলের কিচ্ছু হইব না।” তার এই আকুতি শুনে উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। পরিবারের সদস্যরা জানান, জাহানারা বেগমের শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। তাই তাকে এখনো ছেলের মৃত্যুর আসল খবরটি জানানো হয়নি। তাকে শুধু বলা হয়েছে যে, বাবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে ইতালির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১০ সালে পরিবারের অভাব ঘোচাতে এবং জীবিকার সন্ধানে ফুফাতো বোনের জামাই আমিন উল্যার সহায়তায় ইতালিতে পাড়ি জমান কামাল উদ্দিন বাবুল। বিদেশ যাওয়ার আগে পারিবারিকভাবে একই ইউনিয়নের মমতাজ বেগম আরজুকে বিয়ে করেন তিনি। পরে তাদের সংসারে জন্ম নেয় ছেলে অয়ন ও মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের হাড়ভাঙা সংগ্রাম শেষে ইতালিতে তাদের একটি সুখের সংসার গড়ে ওঠে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, প্রবাসে আরও কয়েক বছর কাজ করে কিছু ডলার বা ইউরো জমিয়ে দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন বাবুল। কিন্তু ঘাতকের ধারালো অস্ত্র তাদের সেই স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে দিয়েছে।

ইতালির স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিও এলাকার একটি পার্কে এই নৃশংস হামলা চালানো হয়। এই হামলায় নিহত হন কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং পাঁচ বছর বয়সী শিশু কন্যা আরোয়া ইসলাম আরিশা। এই বর্বরোচিত হামলায় গুরুতর আহত হয় তাদের ছেলে অয়ন, যে বর্তমানে ইতালির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শুক্রবার রাতে পার্ক এলাকা থেকে মানুষের চিৎকারের শব্দ শুনে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

স্বজনদের দাবি, একই গ্রামের শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাবুলের স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জের ধরেই এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে থাকাকালীন সময় থেকেই বিষয়টি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। পরে স্ত্রী-সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান বাবুল। অন্যদিকে শাহাদাত কয়েক বছর যুক্তরাজ্যে থাকার পর ইতালিতে চলে যান। ঘটনার দিন এই বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যেই উভয়পক্ষের মধ্যে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছিল। বৈঠক চলাকালে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে শাহাদাত ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বাবুল, তার স্ত্রী ও শিশু কন্যা। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে রক্ষা পায় ছেলে অয়ন।

পরিবারের অভিযোগ, এই খুনের ঘটনার পর সন্দেহভাজন শাহাদাত তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রহস্যজনক স্ট্যাটাস দেন। সেখানে লেখা ছিল, “একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।” শনিবার ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাত হোসেনের ছবি প্রকাশ করে তাকে এই ট্রিপল মার্ডার বা ত্রিপল হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে যেকোনো তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

শাহাদাতের বড় ভাই ও সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, “চার বছর আগে শাহাদাত পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না।” অন্যদিকে নিহত বাবুলের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রায় এক বছর আগে তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়ে একটি উড়ো চিঠি পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি তখন মৌখিকভাবে কোম্পানীগঞ্জ থানাকে জানানো হয়েছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “তখন ভয় পেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু কখনো ভাবিনি আমার ছেলেকে এভাবে হারাতে হবে।” কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, “তৎকালীন সময়ে ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।”

চরকাঁকড়ার সেই বাড়িটিতে এখন শুধু কান্নার রোল আর লাশের অপেক্ষা। তবে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—যে মা এখনো জানেন না তার বুকের ধন আর পৃথিবীতে নেই, যার জন্য তিনি প্রতিদিন দরজায় চেয়ে আছেন, সেই বাবুল আর কোনোদিন হাসিমুখে ঘরে ফিরে এসে বলবে না, “মা, আমি আইছি।”

সম্পর্কিত নিবন্ধ