যশোর সদর উপজেলার আরবপুর রঘুরামপুর এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ‘চশমা সাইদ’ হত্যা মামলার জট খুলতে শুরু করেছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাব্বির হোসেন সুমন ওরফে ‘মেছো সুমন’ এবং রোহিত নামের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া মেছো সুমন শহরের ধর্মতলা এলাকার শহিদুজ্জামানের ছেলে এবং রোহিত রঘুরামপুর গ্রামের শফিয়ার রহমানের ছেলে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এই দুজনের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার শক্ত প্রমাণ মিলেছে।
নিহত সাইদ সরদার, যিনি এলাকায় ‘চশমা সাইদ’ (৪০) নামে পরিচিত ছিলেন, কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, তিনি ছিলেন এলাকার একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং মাদক কারবারি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে কোতোয়ালি ও অন্যান্য থানায় অন্তত ১২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মাদক সেবনের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার শুরু গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে। ওই সময় সাইদ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান এবং রাতে আর ফিরে আসেননি। পরের দিন বুধবার সকালে তার বাড়ির খুব কাছেই কামগাজীর পুকুরপাড়ের একটি নির্জন ঝোপ থেকে তার গলাকাটা ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার পরপরই নিহতের বড় ভাই জাহিদ হোসেন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আসামিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করে।
পুলিশের তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের দিন মঙ্গলবার সাইদ সরদারের সাথে অভিযুক্তদের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কথা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, মোবাইল ফোনে কল করেই তাকে খুব কৌশলে ঘটনাস্থলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে। হত্যার পর তার মরদেহ পাশের একটি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখে পালিয়ে যায় তারা।
মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার কারণে সাইদের অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। পুলিশ ধারণা করছে, মাদকের টাকা ভাগাভাগি বা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক সময় সামান্য কিছু টাকার জন্য, যেমন ৫০০বা১০০০ডলারের (ডলারের সমমূল্যের দেশীয় টাকা) জন্য নিজেদের সহযোগীদেরও নির্মমভাবে খুন করতে দ্বিধা করে না। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে এমন কোনো আর্থিক বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আছে কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আশরাফুল আলম জানান, প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া রোহিত ও মেছো সুমনের এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে পুলিশ ১০০% নিশ্চিত হয়েছে যে তারা এই ঘটনার সাথে যুক্ত। গ্রেপ্তারের পর তাদের আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এসআই আশরাফুল আলম আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ পুরোপুরি উদ্ঘাটন করতে পুলিশ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যার পেছনের আসল রহস্য এবং এই চক্রের সাথে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত আছে কি না, তা জানা যাবে। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বাকি আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
















