ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন এই ফরম্যাট নিয়ে সাধারণ দর্শকদের মধ্যে যেমন প্রবল রোমাঞ্চ কাজ করছে, তেমনি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সমালোচনাও কম হচ্ছে না। বিশেষ করে এবারের আসরে ম্যাচের প্রতি অর্ধে খেলোয়াড়দের জন্য যে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতির নিয়ম চালু করা হয়েছে, তা নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে তুমুল বিতর্ক চলছে। অনেকেই মনে করছেন, এই বিরতির কারণে খেলার স্বাভাবিক গতি নষ্ট হচ্ছে। এই সব বিতর্কের মাঝেই ফিফা ও এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে কড়া ভাষায় একহাত নিলেন জার্মানির ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি অধিনায়ক ফিলিপ লাম।
বিশ্বকাপের সার্বিক আয়োজন এবং ফিফার নেওয়া সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জার্মানির জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘ডি জাইট’-এ একটি কলাম লিখেছেন ফিলিপ লাম। সেখানে তিনি ফিফাকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অত্যন্ত কঠোর মন্তব্য করেছেন। লাম তাঁর কলামে লিখেছেন, “আমাদের সবার প্রিয় বিশ্বকাপ এখন আক্ষরিক অর্থেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ব ফুটবলের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। ফিফার এমন সব বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে চরম অস্বস্তি ও হতাশা তৈরি হচ্ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ফিফা এবং বিশ্বকাপকে এখন আলাদা করে দেখা সাধারণ সমর্থকদের জন্য খুব কঠিন হয়ে উঠছে।”
তাঁর এই কলামে এবারের বিশ্বকাপের টিকিটের আকাশছোঁয়া মূল্য নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক এই জার্মান ডিফেন্ডার। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে টিকিটের দাম নির্ধারণ করায় তিনি ফিফার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে বেশ সন্দিহান। লাম অভিযোগ করে বলেন, “ফিফার বিরুদ্ধে বর্তমানে একটি বড় অভিযোগ আছে যে তারা দর্শকদের প্রকৃত চাহিদা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। উল্টো সেই চাহিদাকে পুঁজি করে তারা নিজেদের আয় বা মুনাফাকে সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করছে।” একটি সাধারণ টিকিটের দাম যদি ১০০বা২০০(ডলার) এর বেশি হয়ে যায়, তবে সাধারণ ফুটবল ভক্তদের পক্ষে মাঠে গিয়ে খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এবারের বিশ্বকাপে ১৬টি দল বেড়ে মোট ৪৮টি দল নিয়ে টুর্নামেন্ট হচ্ছে। এছাড়া ফিফার ভেতরে প্রায়ই প্রতি দুই বছরে একটি বিশ্বকাপ আয়োজনের আলোচনাও সামনে আসে। এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ দ্বিমত প্রকাশ করে লাম তাঁর কলামে অত্যন্ত যৌক্তিক কিছু কথা লিখেছেন। তিনি বলেন, “একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের যদি দীর্ঘমেয়াদি ও ইতিবাচক প্রভাব রাখতে হয়, তবে তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি এবং টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরবর্তী কার্যক্রমের প্রয়োজন। দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ হলে এর আসল আকর্ষণ ও মান অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
তবে এত কড়া সমালোচনার পাশাপাশি ফিফার একটি ইতিবাচক দিকও খুঁজে পেয়েছেন ফিলিপ লাম। ৪৮ দলের এই বিশাল আকারের বিশ্বকাপকে তিনি মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দলের সংখ্যা ৪০% বা ৫০% বেড়ে যাওয়ার কারণে এবার স্কটল্যান্ড, ডিআর কঙ্গো কিংবা কেপ ভার্দের মতো ছোট দলগুলোর জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার এবং নতুন গল্প তৈরি করার দারুণ এক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই ছোট দলগুলো বিশ্বকাপে আসায় ফুটবলের বিশ্বায়ন আরও বেশি দ্রুত হবে বলে তিনি মনে করেন।
অবশ্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর ফিলিপ লামের এমন চটে যাওয়া এবারই প্রথম নয়। তিনি এর আগেও ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে গত ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ চলাকালেও তিনি ফিফা সভাপতির নানা বিতর্কিত মন্তব্যের সমালোচনা করে প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, ইনফান্তিনোর মধ্যে ‘সততার অভাব’ আছে। লামের মতো একজন বিশ্বজয়ী ও অত্যন্ত সম্মানীয় অধিনায়কের এমন কড়া সমালোচনা ফিফার নীতিনির্ধারকদের আগামী দিনে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে বলে অনেক ফুটবল বিশ্লেষক মনে করছেন।














