একটি সুস্থ, সুন্দর ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মের সঠিক মানসিক বিকাশ। ছাত্রজীবন থেকেই যদি শিক্ষার্থীদের মনে নৈতিক মূল্যবোধ ও সততার বীজ বপন করা যায়, তবে ভবিষ্যতে তারা কখনোই দুর্নীতির পথে পা বাড়াবে না। এই মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক জমজমাট ও শিক্ষণীয় দুর্নীতিবিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বুধবার পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে এই যুক্তির লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সরাসরি সহযোগিতায় এবং পীরগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এই চমৎকার আয়োজন সম্পন্ন হয়।
বিতর্ক প্রতিযোগিতার মূল মঞ্চে এদিন মুখোমুখি হয়েছিল পীরগঞ্জ উপজেলার স্বনামধন্য দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং নর্থ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করার উপায় এবং তরুণ সমাজের ভূমিকা। উভয় দলের বিতার্কিকরাই অত্যন্ত সাবলীল ও জোরালো যুক্তিতর্কের মাধ্যমে নিজেদের দলের অবস্থান বিচারকদের সামনে তুলে ধরেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই যুক্তির লড়াইয়ে উপস্থিত দর্শক ও শিক্ষার্থীরা রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত চমৎকার তথ্য-উপাত্ত এবং অকাট্য যুক্তির জোরে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় দল। অন্যদিকে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে রানার্সআপের সম্মান নিয়ে মাঠ ছাড়ে নর্থ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ দল।
আমাদের দেশের অর্থনীতিতে দুর্নীতির নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতি বছর দুর্নীতির কারণে দেশের মোট বাজেটের প্রায় ২% থেকে ৩% অর্থ অপচয় হয়, যার পরিমাণ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার হাজার কোটি টাকার সমান। এই বিশাল অঙ্কের টাকা যদি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা যোগাযোগ খাতে সঠিকভাবে খরচ করা যেত, তবে আমাদের দেশ আরও অনেক দ্রুত উন্নত হতে পারত। শিক্ষার্থীরা তাদের বিতর্কে এই বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরে। তারা জোরালোভাবে বলে যে, দুর্নীতি শুধু টাকার অঙ্কেই মাপা যায় না, এটি একটি দেশের সামগ্রিক নৈতিক মেরুদণ্ডকেও ১০০% ভেঙে দেয়। তাই সমাজ থেকে দুর্নীতিকে সমূলে উৎপাটন করতে হলে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।
বিতর্ক প্রতিযোগিতার মূল পর্ব শেষ হওয়ার পর এক অনাড়ম্বর ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ী এবং রানার্সআপ দলের শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। অতিথিরা শিক্ষার্থীদের গলায় মেডেল পরিয়ে দেন এবং তাদের হাতে আকর্ষণীয় সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র (সার্টিফিকেট) তুলে দেন। পুরস্কার হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখা যায়। উপস্থিত শিক্ষক ও অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের এমন চমৎকার বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্যে অনেক গর্ববোধ করেন। আয়োজকরা জানান, এই ধরনের প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের শুধু কথা বলার জড়তাই কাটায় না, বরং তাদের যেকোনো বিষয়ের গভীরে গিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতাও অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই পুরস্কার বিতরণী ও আলোচনা অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পীরগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এন এম ইশফাকুল কবীর। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আজকের এই শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তবে কোনো অপশক্তিই দেশের ক্ষতি করতে পারবে না। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন সৃজনশীল ও মননশীল চর্চা নিয়মিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরাও এই সুন্দর আয়োজনে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ জোগান। পীরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক নসরতে খোদা রানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তরুণ বিতার্কিকদের প্রশংসা করেন। তারা বলেন, সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরতে সাংবাদিকদের পাশাপাশি বিতার্কিকদেরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোকাদ্দেস হায়াত মিলন, সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক এবং কমিটির অন্যান্য সক্রিয় সদস্য যেমন মিজানুর রহমান ও মিরাজুল ইসলাম এই আয়োজনে উপস্থিত থেকে পুরো অনুষ্ঠানটিকে সফল করতে সাহায্য করেন।
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আয়োজক এবং অতিথিরা সবাই একবাক্যে বলেন, দুর্নীতি একটি জাতীয় ব্যাধি। এই ব্যাধি দূর করতে হলে শুধু আইন বা পুলিশ দিয়ে কাজ হবে না, বরং প্রতিটি মানুষের ভেতর থেকে জাগরণ আসতে হবে। পীরগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি আগামী দিনেও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন আরও অনেক শিক্ষামূলক ও দুর্নীতিবিরোধী জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা আশা প্রকাশ করেন, আজকের এই বিতার্কিকরাই একদিন একটি শতভাগ (১০০%) দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেবে।














