অনলাইন জুয়া ও বেটিং রুখতে সংসদে নতুন বিল: থাকছে কোটি টাকা জরিমানাসহ কঠোর সাজা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশে বর্তমানে অনলাইন জুয়া, বেটিং এবং ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো অপরাধগুলো ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে অনেক সাধারণ মানুষ এই জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিজেদের সর্বস্ব হারাচ্ছেন। এসব অপরাধ কঠোর হাতে দমন করতে এবার জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ’ নামে একটি নতুন বিল আনা হয়েছে। এই বিলে জুয়া, অনলাইন জুয়া, বাজি বা পণ (বেটিং), ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংসহ মোট ২৪ ধরনের জুয়া ও প্রতারণাকে খুব স্পষ্ট ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মোট ১৪ ধরনের কঠোর সাজার বিধান রাখা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি উত্থাপন করেন। বিলটি তোলার পর সংসদ সদস্যরা এটি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেন। এরপর বিলটি আরও ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংসদে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত ১৮৬৭ সালের অত্যন্ত পুরোনো ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ পুরোপুরি বাতিল করে যুগের সাথে তাল মেলাতেই এই নতুন ‘জুয়া প্রতিরোধ’ আইনটি তৈরি করা হচ্ছে।

নতুন এই বিলে বিভিন্ন ধরনের জুয়ার অপরাধের জন্য সাজার মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক গুণ বাড়ানো হয়েছে। বিলে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাধারণ জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে তাকে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আর কেউ যদি মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী কোনো জুয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তবে তার সাজা হবে আরও কঠিন। সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।

বর্তমান সময়ে খেলাধুলায় ‘বেটিং’ বা বাজির চল অনেক বেড়ে গেছে। অনেকেই বিদেশি বিভিন্ন বেটিং সাইটে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে বিনিয়োগ করছেন। এই বিলে বলা হয়েছে, কেউ যদি অনলাইন বেটিংয়ে সম্পৃক্ত হন, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এছাড়া খেলাধুলায় দুর্নীতি অর্থাৎ ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ ব্যাখা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ একটি লিখিত বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা যে ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ মেনে চলছি, সেটি ১৮৬৭ সালের তৈরি অর্থাৎ প্রায় দেড় শ বছরের বেশি পুরোনো একটি আইন। সেই যুগে অনলাইনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আমাদের সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে জুয়া নিরোধের জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা আছে। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই পুরোনো আইনটি যুগোপযোগী করে দণ্ডের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিবৃতিতে বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধগুলোর কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান যুগে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চ্যুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া, ভুয়া সিম এবং ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের বিদ্যমান পুরোনো আইনটি একেবারেই অপর্যাপ্ত। অপরাধীরা এখন অনেক বেশি চালাক হয়ে গেছে। তারা অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন (VPN), ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্ট এবং বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে জুয়া ও প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

এই ডিজিটাল জুয়ার কারণে দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, এই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘটিত জুয়া, অর্থ পাচার ও প্রতারণা বাংলাদেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা এবং বিশেষ করে আমাদের তরুণসমাজের জন্য এক গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। অনেক তরুণ জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই এই সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় এখনই থামাতে হবে।

সময়ের সাথে সাথে জুয়ার বিস্তারে এখন অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। তাই জনশৃঙ্খলা রক্ষা, সমাজে অপরাধ প্রবণতা হ্রাস এবং মানুষের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করতে এই নতুন আইনটি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। সরকার মনে করে, রাষ্ট্রের সার্বিক নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে এমন একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নতুন এই বিলটি পাস হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে সবাই আশা করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ