ডেঙ্গুর ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কা: মশা মারতে মাঠে নামছে সেনাবাহিনী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় এখন এক নতুন ও ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ করছে। দেশটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ এমন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, প্রতিদিন হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে ডাক্তার ও নার্সরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। এমন চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর বিস্তার মোকাবিলা করতে এবং সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা সরকার দেশজুড়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের কার্যালয় থেকে এই জরুরি পদক্ষেপের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এডিস মশার প্রজননস্থলগুলো খুব দ্রুত চিহ্নিত করতে এবং সেগুলো চিরতরে ধ্বংস করতে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা একটি বিশেষ টাস্কফোর্সে সরাসরি যোগ দেবেন। এই টাস্কফোর্স সারা দেশের অলিগলি ঘুরে মশার উৎস খুঁজবে। শুধু তাই নয়, সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে মশার প্রজনন ঘটবে, তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা জেলের মতো অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্রীলঙ্কা সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এই হঠাৎ ডেঙ্গু বাড়ার পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করেছেন। তারা বলছেন, দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর বিভিন্ন খানাখন্দ ও ডোবায় পানি জমে আছে। এর পাশাপাশি যত্রতত্র ও অপরিকল্পিতভাবে ফেলে রাখা প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যে বৃষ্টির পরিষ্কার পানি জমে এডিস মশার দ্রুত বংশবিস্তারের জন্য ১০০% আদর্শ একটি পরিবেশ তৈরি করেছে। এসব বিপজ্জনক প্রজননস্থল পরিষ্কার করতে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে আজ বুধবার থেকে দেশব্যাপী এক বিশাল অভিযান শুরু করা হবে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শ্রীলঙ্কার বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা খুব সহজেই বোঝা যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৫০ হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আর এই মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে ২৯ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে চলতি জুন মাসের শুরু থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করেছে, যা স্বাস্থ্য বিভাগকে চরম ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। যদিও এই সংখ্যাটি ২০১৭ সালে রোগটির সেই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের তুলনায় এখনো বেশ কম। সে বছর দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৪৪০ জন মানুষ মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

তবে শ্রীলঙ্কা সরকারের জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিট এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, এ বছর রোগীর সংখ্যা যদি বর্তমান হারে আরও বাড়তে থাকে, তবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ রোগী সামাল দেওয়া পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে বা বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের প্রধান কপিলা কানানগারা সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, “আমাদের হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। শয্যা ও ওষুধের সংকট দেখা দিতে পারে। আমরা কোনোভাবেই চাই না যে ২০১৭ সালের মতো সেই ভয়াবহ ও মৃত্যুপুরীর পরিস্থিতি আবার তৈরি হোক।”

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছেও এই ডেঙ্গু একটি অতি পরিচিত ও আতঙ্কের নাম। বাংলাদেশেও প্রতি বছর বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে এবং অনেক মানুষ মারা যায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত একজন রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করালে অনেক সময় হাজার হাজার টাকা বা ৫০০থেকে১০০০ (ডলার) পর্যন্ত বিল চলে আসে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক বিশাল আর্থিক ধাক্কা। তাই শ্রীলঙ্কার এই পরিস্থিতি আমাদের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। মশা মারার জন্য শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, আমাদের নিজেদের বাড়ির চারপাশও নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ