খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা। পাহাড় আর সবুজে ঘেরা এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা সমতল এলাকার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও সংগ্রামের। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দীর্ঘদিনের এক বড় সমস্যা। পাহাড়ের ঝিরি বা কুয়ার পানিই তাদের একমাত্র ভরসা, যা বর্ষাকালে ঘোলা হয়ে যায় এবং শুকনা মৌসুমে শুকিয়ে যায়। এই দূষিত পানি পান করে পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৪০% থেকে ৫০% মানুষ সারা বছর নানা ধরনের পানিবাহিত রোগে ভোগেন। তবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং সাধারণ মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে এবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের একটি দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে একটি গভীর নলকূপ ও আধুনিক সাবমারসিবল মোটর স্থাপন করে দিয়েছে।
দীঘিনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের ধনপাতাছড়া এলাকার করুনা চাঁন বাঙ্গালে কার্বারীপাড়ায় এই মহতী উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন (৪-ইবি)। সোমবার সকালে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে একটি ছোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়ার দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হওয়া এলাকাবাসীর জন্য এই গভীর নলকূপটি যেন এক আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। এখন আর তাদের কয়েক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে এক কলসি খাবার পানি আনতে হবে না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গ্রামবাসীদের দেওয়া তথ্যমতে, সেনাবাহিনীর স্থাপিত এই গভীর নলকূপ ও সাবমারসিবল মোটরের মাধ্যমে ওই দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রায় ১০০টি পরিবারের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। হিসাব করলে দেখা যায়, এই আধুনিক পানির পাম্পটির মাধ্যমে প্রতিদিন গ্রামের প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি খুব সহজেই সংগ্রহ করতে পারবেন। আমরা জানি, বর্তমান বিশ্বে এমন একটি গভীর নলকূপ ও সাবমারসিবল পাম্প বসাতে প্রায় ৫০০থেকে১০০০(ডলার) বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। গ্রামের গরিব পাহাড়ি মানুষদের পক্ষে এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করে পানির ব্যবস্থা করা ১০০% অসম্ভব একটি ব্যাপার। আর্থিক এই চরম সংকটের কারণেই তারা এতদিন দূষিত পানি পান করে আসছিলেন।
সোমবার সকালের এই চমৎকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন দীঘিনালা জোনের সুযোগ্য জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আল-আমিন, এসইউপি, পিএসসি। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পাম্পের সুইচ চালু করে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি উপস্থিত সাধারণ মানুষের সাথে বেশ কিছুক্ষণ হাসিমুখে গল্প করেন এবং পানির অপচয় না করার জন্য তাদের পরামর্শ দেন। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গগন বিকাশ চাকমা, স্থানীয় হেডম্যান, কার্বারী এবং উপকারভোগী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেক নারী-পুরুষ।
বিশুদ্ধ পানির এই নতুন ব্যবস্থা পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখেমুখে যে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তা ছিল সত্যিই দেখার মতো। গ্রামের বয়স্ক নারীরা জানান, বিশুদ্ধ পানির এই চমৎকার ব্যবস্থা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দেবে। আগে পানি আনতেই তাদের দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যেত। এখন তারা সেই সময়টা জুম চাষ বা অন্য কোনো আয়ের কাজে লাগাতে পারবেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশুদ্ধ পানি পানের ফলে এলাকার মানুষের, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের পানিবাহিত নানা রোগ যেমন— ডায়রিয়া, টাইফয়েড বা কলেরার ঝুঁকি অন্তত ৬০% থেকে ৭০% কমে যাবে। এতে তাদের চিকিৎসার খরচ বাঁচবে এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সেনাবাহিনীর এমন জনবান্ধব উদ্যোগকে মন থেকে সাধুবাদ জানান। তারা বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিয়ে আসছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তারা যেভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে, তা পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। পাহাড়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতি ধরে রাখতে এমন মানবিক কাজের কোনো বিকল্প নেই।
দীঘিনালা জোনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে যে, পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও মৌলিক চাহিদা পূরণে তাদের এমন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম শুধু আজ নয়, ভবিষ্যতেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে। পাহাড়ি এলাকার মানুষও বিশ্বাস করেন, সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের এই চমৎকার সম্পর্ক আগামী দিনে পাহাড়ের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
















