জব্দ করা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ফেরত পাচ্ছে ইরান, শান্তি আলোচনার পথে বড় অগ্রগতি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতা ও যুদ্ধের ঘনঘটার মাঝে এবার কিছুটা শান্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার বা ১২ বিলিয়ন ডলার ($) সম্পদ ছাড় করার বিষয়ে রাজি হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই তথ্য জানান। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পেলে অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকতে থাকা ইরান বিশাল এক স্বস্তি পাবে।

এই শান্তি আলোচনা আরও এগিয়ে নিতে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইতিমধ্যে চারটি আলাদা ওয়ার্কিং গ্রুপ বা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বিভিন্ন বন্দর ঘিরে এতদিন যে কঠোর মার্কিন নৌ অবরোধ ছিল, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে তিনি স্বভাবসুলভ কড়া ভাষায় এও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরান যদি চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ করে বা নিয়ম না মানে, তবে তাদের বিরুদ্ধে যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, যুক্তরাষ্ট্র তা-ই করবে।

তবে এই শান্তি চুক্তির পথে এখনো একটি বড় বাধা রয়ে গেছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল এখনো লেবাননে তাদের সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় আরও অন্তত ১৭ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক হামলা বন্ধ করতে হবে। ইরান প্রথম থেকেই এই শর্তটির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে আসছিল।

সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি শান্তি আলোচনা শুরু হয় গত রোববার। প্রথম দিনের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন খোদ পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। তিনি সোমবার সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের মোট ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড় করতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দুই দফায় ৬০০ কোটি ডলার করে ইরানের হাতে তুলে দেওয়া হবে। গালিবাফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার থেকে আগামী ৬০ দিনের জন্য এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। একই দিন ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন-ইরান আলোচনার ভেতরের খবর জানেন এমন একাধিক সূত্র আল-জাজিরাকে নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়টি একেবারে চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এ নিয়ে খুব শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা সই হতে পারে। সূত্রগুলো আরও জানায়, গত ১৭ জুন সই হওয়া ১৪ দফার প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিন যে আলোচনা চলবে, সেই সময়ের মধ্যে ইরান আরও ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড় পেতে পারে। আর যদি দুই পক্ষ সফলভাবে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তবে সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ তহবিলসহ ইরান প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার বা ৫০ বিলিয়ন ডলার ($) ছাড় পেতে পারে, যা তাদের অর্থনীতির চেহারা পুরোপুরি বদলে দেবে।

তবে এই বিশাল তহবিল ইরান ঠিক কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, জব্দ করা এই অর্থ দিয়ে ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই খাদ্যপণ্য কিনতে পারবে। তিনি বলেন, “এই অর্থ দিয়ে তারা শুধু আমাদের দেশের কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্য কিনতে পারবে, যা তাদের এখন খুব দরকার।” কিন্তু ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, সমঝোতা অনুযায়ী এই অর্থ দিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য কেনার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রথম ৬০০ কোটি ডলার দিয়ে নিত্যপণ্য ও অতি জরুরি ওষুধ কেনার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। ইরান বিশ্ববাজার যাচাই করে যেখান থেকে সবচেয়ে কম দামে পণ্য পাবে, সেখান থেকেই কিনবে।

পাকিস্তান ও কাতারের সফল মধ্যস্থতায় গত ১৭ জুন সই হওয়া এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানকে আবারও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “ইরান যদি চুক্তি মেনে না চলে বা ঠিকঠাক আচরণ না করে, তবে আমি যা করা দরকার তা-ই করব।” ট্রাম্পের এমন এলোপাতাড়ি হুমকির পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি কড়া বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলোচনার অগ্রগতি নির্ভর করছে সমঝোতা হওয়া বিষয়গুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে তার ওপর। নথির বাইরে গিয়ে এমন হুমকি দিলে তা আলোচনা এগিয়ে নিতে কোনোভাবেই সাহায্য করবে না।

বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের গভীর আলোচনা চলছে। গত রোববারের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এখন নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি, আর্থিক লেনদেন ও সমঝোতা স্মারক নিয়ে চারটি ওয়ার্কিং গ্রুপের মধ্যে আলোচনা চলছে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হোসেইন মৌসাভি মনে করেন, সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে যেভাবে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠক চলছে, তাতে এই শান্তি চুক্তি নিয়ে ১০০% আশাবাদী হওয়া যায়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরানোর এক সুবর্ণ সুযোগ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ