শাহজালাল মাজারে ৪ দিনের দানে মিলল ১৮ লাখ টাকা, ডিসি প্রত্যাহার নিয়ে সিলেটে উত্তেজনা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সিলেটের বিখ্যাত হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে অনেক দিন ধরেই সাধারণ মানুষের মনে নানা কৌতূহল ছিল। সেই কৌতূহল মেটাতে এবং মাজারের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন সম্প্রতি একটি সাহসী উদ্যোগ নেয়। জেলা প্রশাসনের সিলগালা করা ঐতিহাসিক তিনটি ডেক এবং নতুন করে বসানো দানবাক্সগুলো খুলে টানা চার ঘণ্টা ধরে টাকা গণনা করা হয়েছে। আজ সোমবার এই টাকা গণনা শেষে দেখা যায়, মাত্র চার দিনে মাজারের দানবাক্সগুলোতে প্রায় ১৮ লাখ টাকা জমা পড়েছে। নগদ টাকার পাশাপাশি সেখানে ৭ আনা ওজনের কিছু স্বর্ণালংকার এবং কয়েকটি বিদেশি মুদ্রাও পাওয়া গেছে। মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে প্রকাশ্যে এভাবে দানের টাকা গণনার ঘটনা এটিই প্রথম।

জেলা প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষের সূত্র থেকে জানা যায়, দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ ভক্ত ও অনুরাগীরা প্রতিদিন হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে আসেন। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার এবং শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে এখানে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। মাজার জিয়ারত শেষে ভক্তরা তাদের মানত বা ভক্তি থেকে টাকাসহ নানা ধরনের মূল্যবান সম্পদ মাজারে দান করেন। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ দানের টাকা ঠিক কীভাবে খরচ হয়, তার কোনো ১০০% পরিষ্কার হিসাব সাধারণ মানুষের কাছে ছিল না।

আয়-ব্যয়ের এই স্বচ্ছতা আনতেই সদ্য প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম গত বৃহস্পতিবার বিকেলে একটি বড় পদক্ষেপ নেন। তার উদ্যোগেই মাজারে থাকা তিনটি বড় ঐতিহাসিক ডেক এবং একটি ছোট দানবাক্স সিলগালা করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রশাসনের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সেখানে নতুন করে আরও চারটি দানবাক্স বসানো হয়। চার দিন পর আজ বেলা দুইটায় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এসব ডেক ও দানবাক্স খোলা হয়। টাকা গণনার কাজ শুরু হওয়ার আগে ডিসি মো. সারওয়ার আলম নিজে মাজারে উপস্থিত ছিলেন এবং গণনার একেবারে শেষ পর্যায়ে তিনি মাজার এলাকা ত্যাগ করেন।

টাকা গণনা শেষে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সিলেটের ওয়াক্‌ফ কর্মকর্তা মো. সজল মিয়া সাংবাদিকদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দানের হিসাব তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে জেলা প্রশাসকের সরাসরি নির্দেশে মাজারের ওই ডেকগুলো সিলগালা করা হয়েছিল। আজ দুপুর দুইটায় সেগুলো খোলার পর মোট আটটি ডেক ও দানবাক্স থেকে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি ৭ আনা স্বর্ণালংকার এবং ৫ রিয়ালের দুটি সৌদি নোট বা মুদ্রা মিলেছে। এই বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও অন্যান্য সম্পদ হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের নামে থাকা নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে খুব দ্রুত জমা করে দেওয়া হবে।

তবে মাজারের এই ঐতিহাসিক ডেক সিলগালা করার ঘটনাটি সিলেটে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম যখন এই পদক্ষেপ নেন, তখন থেকেই তার পক্ষে-বিপক্ষে সিলেটজুড়ে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। সমাজের একদল সচেতন নাগরিক দাবি করেন, মাজারের আয়-ব্যয়ে ১০০% স্বচ্ছতা আনতে ডিসি একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সাহসী উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু মাজারের খাদেম ও ভক্তদের আরেক অংশের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বলছেন, মাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার নামে ডিসির এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ছিল সম্পূর্ণ একতরফা এবং জোরপূর্বক। তারা মনে করেন, প্রশাসনের এমন আচরণ মাজারকেন্দ্রিক প্রচলিত শত বছরের পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং অপমানজনক।

এই পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যেই গতকাল রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হঠাৎ করে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপনে ডিসি সারওয়ার আলমকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেতী প্রুর সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে প্রজ্ঞাপনে তাকে কেন প্রত্যাহার করা হলো বা তার জায়গায় নতুন কে দায়িত্ব নেবেন, সে বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক একাধিক সূত্র দাবি করছে, সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে মো. সারওয়ার আলম তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য সব সময়ই বেশ আলোচনায় ছিলেন। বিশেষ করে সম্প্রতি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহ পরান (রহ.)-এর মাজার নিয়ে তার এই নতুন উদ্যোগগুলো একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক তৈরি করে। এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একটি প্রভাবশালী অংশও বিভিন্ন কারণে তার শক্ত বিরোধিতা করছিল। স্থানীয়রা মনে করছেন, এসব চাপের কারণেই তাকে এত দ্রুত বদলি হতে হলো।

এদিকে ডিসির এই আকস্মিক প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে তাকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে সিলেটে বড় ধরনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। ‘সচেতন সিলেটবাসী’র ব্যানারে দ্বিতীয় দিনের মতো আজও সিলেটে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বেলা ১১টা এবং বেলা ২টার দিকে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। এছাড়া একই দাবিতে দুপুরে নগরের কোর্ট পয়েন্টে সড়ক অবরোধ করা হয় এবং বিকেলে চৌহাট্টা এলাকায় বিশাল একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, একজন সৎ কর্মকর্তাকে এভাবে বদলি করা হলে সমাজে দুর্নীতির মাত্রা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ