সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে হঠাৎ প্রত্যাহার, মাজারের দানবাক্স নিয়ে সমালোচনাই কি কারণ?

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে তাঁর বর্তমান পদ থেকে হঠাৎ করেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়েছে। আজ রোববার বিকেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই বদলির খবর জানানো হয়। হঠাৎ করে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদের রদবদল নিয়ে সিলেটে এখন চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিশেষ করে সম্প্রতি মাজারের দানবাক্স নিয়ে তাঁর একটি পদক্ষেপের পরেই এই বদলির আদেশ আসায় বিষয়টি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রোববার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে যোগাযোগ করা হলে মো. সারওয়ার আলম নিজে তাঁর প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে ঠিক কী কারণে বা কেন তাঁকে এত দ্রুত বদলি করা হলো, সে বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে ওই প্রজ্ঞাপনে ডিসিকে প্রত্যাহারের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা সিলেটের নতুন ডিসি হিসেবে কে দায়িত্ব নেবেন, তার কোনো উল্লেখ নেই।

সিলেটের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলের একটি সূত্র দাবি করেছে, সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে মো. সারওয়ার আলম বেশ কয়েকটি ঘটনায় আলোচিত ছিলেন। তবে সম্প্রতি সিলেটের বিখ্যাত হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার ইস্যুতে তাঁর নেওয়া কিছু উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই মনে করছেন, মাজারের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কারণেই হয়তো তাঁকে এমন আকস্মিক বদলির মুখে পড়তে হলো।

সূত্র জানায়, গত ১২ জুন ডিসি সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্ত এই মাজারগুলোতে আসেন এবং দানবাক্সে কোটি কোটি টাকা বা লাখ লাখ ডলার ($) সমপরিমাণ অর্থ দান করেন। পরিদর্শনের সময় ডিসি ঘোষণা দেন যে, মাজারের এই বিপুল আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় ১০০% স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশাসন নতুন উদ্যোগ নেবে। তাঁর এই ঘোষণার অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মাজারে থাকা পুরোনো দানবাক্সগুলো সিলগালা করে প্রশাসনের অধীনে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। শুধু তাই নয়, মাজারে মানুষের দানের অর্থ ও চাল-ডাল রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি বড় দানের ডেগও সিলগালা করে দেওয়া হয়।

ডিসি সারওয়ার আলমের এই পদক্ষেপের পরপরই সিলেটে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। সমাজের একদল মানুষ জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগকে বেশ ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানান। তারা মনে করেন, মাজারের আয়-ব্যয়ে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ থাকলে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু অন্যদিকে, মাজারের ভক্ত ও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ প্রশাসনের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মাজারের খাদেম ও ভক্ত-অনুসারীরা জানান, প্রায় সাত শ বছর ধরে যে ঐতিহ্য ও প্রক্রিয়ায় এই মাজার পরিচালিত হয়ে আসছে, ডিসির এই কাজ সেই ঐতিহ্যকে পুরোপুরি বিনষ্ট করেছে।

মাজারের ভক্তরা আরও অভিযোগ করেন, যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দানবাক্সে প্রশাসন সিলগালা করেছে, সেটা মোটেও কোনো সঠিক বা সম্মানজনক পদ্ধতি ছিল না। অনেকেই এটিকে মাজার ও অলি-আউলিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দেন। তাদের মতে, প্রশাসন চাইলে মাজার কমিটির কাছে আয়ের হিসাব চাইতেই পারে, কিন্তু এভাবে জোরজবরদস্তি করে মাজারের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হয়নি। এই ক্ষোভের খবর হয়তো সরকারের উচ্চ মহলেও পৌঁছেছে, যার পরিণতি হিসেবে ডিসিকে বদলি করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মো. সারওয়ার আলম গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। সিলেটে যোগ দেওয়ার আগে তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় সিলেটের বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর লুট ও চুরির ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই অস্থিরতার মধ্যেই তখন জেলা প্রশাসক পর্যায়ে পরিবর্তন এনে তাঁকে সিলেটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন তাঁর এই হঠাৎ বিদায়ে সিলেটের মানুষের মাঝে আবার নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ