ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যর্থতা: বিশ্বরাজনীতিতে নতুন বার্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

শুধু আধুনিক অস্ত্র আর বিপুল সামরিক শক্তি থাকলেই যে যুদ্ধে ১০০% রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করা যায় না, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ বিশ্ববাসীকে সেই সত্যটি খুব ভালোভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বর্তমান আধুনিক যুগে যুদ্ধ আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে এবং এর ফলাফল কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তিশালী দেশের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকছে না। ‘রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিওদর লুকিয়ানভ সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ ও এর ফলাফল নিয়ে এমনই এক বাস্তব ও চমকপ্রদ বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাঠ্যবইয়ে স্থান পাওয়ার মতো একটি ঘটনা, যা প্রমাণ করেছে বিশ্ব মঞ্চে শক্তি ব্যবহারের পুরোনো ছক এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ধনী উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত শক্তিশালী জোটটি ভেবেছিল, তারা খুব সহজেই তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষ ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে। তাদের ধারণা ছিল, দ্রুত এবং বিধ্বংসী বিমান হামলা চালালে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং তেহরান ভয় পেয়ে তাদের সব শর্ত মেনে নেবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক তার উল্টোটা। আক্রমণকারী পক্ষের বিশাল শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইরান অপ্রত্যাশিতভাবে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরুতে দেশের ভেতরে বড় ধরনের আঘাত এলেও ইরান ভেঙে পড়েনি। বরং তারা খুব দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করে, শক্তি সঞ্চয় করে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমকক্ষ ছিল না। কিন্তু তাদের সেই সমকক্ষ হওয়ার কোনো প্রয়োজনও হয়নি। কারণ, তারা তাদের হাতে থাকা বিকল্প উপায়গুলো এমন সুকৌশলে ব্যবহার করেছে, যা প্রতিপক্ষের অনেক বড় বড় সক্ষমতাকে কার্যত অকেজো করে দিয়েছে। প্রথমত, ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল পরিবহন হয়। দ্বিতীয়ত, তারা শুধু ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদকেই নিশানা করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের তেল স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে। তৃতীয়ত, তাদের বিশাল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় কম সমৃদ্ধ হলেও, তা প্রতিপক্ষের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

বর্তমান পরিস্থিতি খুব স্পষ্টভাবে একটি বার্তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেসব বিষয় বা শর্তকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার একটিরও সমাধান শেষ পর্যন্ত হয়নি। বাধ্য হয়ে সবকিছু আবার ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য স্থগিত করে একটি শান্তি চুক্তি করতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালি আবার জাহাজ চলাচলের জন্য হয়তো খুলে দেওয়া হবে, কিন্তু এর শর্তাবলি এখনো পরিষ্কার নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, শুধু সামরিক শক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ এখন বিশ্বে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে আসছে। দুর্বল পক্ষের প্রতিরোধ সক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে, শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের দেশের ভেতরের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলার প্রবণতা অনেকটাই কমে গেছে।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব হলো বিশ্বের একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের চরম দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি আরেকটি পূর্ণমাত্রার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়াতে একেবারেই অনাগ্রহী। তিনি নিজে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তাতে কোনো ঘোষিত লক্ষ্যই তিনি অর্জন করতে পারেননি। এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্য মিত্র দেশগুলো একটি স্পষ্ট বার্তা পেয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, শুধু নিজেদের মর্যাদা ও প্রভাব বজায় রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো দেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। তাই ভবিষ্যতে কোনো বড় সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য সামরিক ঝুঁকি নেবে, এমনটা তারা আর ১০০% নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলছিল, তা এই যুদ্ধের ফলে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এই কৌশলটি মূলত ২০২৩ সালে ইসরায়েল ও হামাসের গাজা যুদ্ধে প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্যের অধীনে স্থায়ীভাবে পুরো অঞ্চলটিকে পুনর্গঠন করা। ভাবা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হবে। কিন্তু ইরানকে আঞ্চলিক সমীকরণ থেকে সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সেই বিশাল পরিকল্পনায় বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই তুলনামূলক ব্যর্থতা এবং তেহরানের কৌশলগত সাফল্য সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য এখন ইরানের দিকেই কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে।

ইরানের নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের ওপর এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে। তারা এই সুযোগ কীভাবে বিশ্বমঞ্চে কাজে লাগায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যেহেতু কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি এবং কোনো স্থিতিশীল আঞ্চলিক শৃঙ্খলাও গড়ে ওঠেনি, তাই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতার ঝুঁকি এখনো থেকেই গেছে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, যে যুগে শুধু সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে নিশ্চিতভাবে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যেত, সেই যুগ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে এখনো বিপুল সামরিক শক্তি থাকলেও ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু এই শক্তি দিয়ে আর যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করা যাবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ