মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবং যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে দেশজুড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাও এর বাইরে নয়। এই উপজেলার সাধারণ মানুষকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পুলিশ বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শৈলকুপা থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের একটি যৌথ ও সাহসী অভিযানে আলাদা তিনটি স্থান থেকে তিন চিহ্নিত মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে হাতেনাতে আটক করা হয়। আটকের পর মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রদান করা হয়েছে।
প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় শৈলকুপার মিনগ্রাম এলাকায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. সুজন শেখ নামের ৩৪ বছর বয়সী এক মাদক কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ তার শরীর তল্লাশি করে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ১০ পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। সুজনের পিতার নাম শুকুর আলী এবং তার বাড়ি এই মিলগ্রামেই। সে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার তরুণদের কাছে এই মরণনেশা ইয়াবা বিক্রি করে আসছিল বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করে তাকে আদালতে পাঠানো হবে।
দ্বিতীয় অভিযানটি ছিল বেশ চাঞ্চল্যকর। শৈলকুপার বাহির রয়েড়া এলাকা থেকে মোহাম্মদ নোমান হাসান বিপ্র নামের মাত্র ২২ বছর বয়সী এক তরুণকে মাদক সেবন ও রাখার অপরাধে আটক করা হয়। তার পিতার নাম মোহাম্মদ শাহিন পারভেজ। এত অল্প বয়সে একজন তরুণের এমন জঘন্য নেশার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষকে রীতিমতো অবাক ও হতাশ করেছে। আটকের পরপরই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে একটি মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। নোমান নিজের অপরাধ স্বীকার করায় এবং হাতেনাতে প্রমাণ মেলায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে সরাসরি ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন।
তৃতীয় অভিযানটি পরিচালিত হয় বিকেল ৫টা ১১ মিনিটে শৈলকুপার বিত্তিপাড়া এলাকায়। সেখান থেকে মো. সিদ্দিক আলী নামের ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধকে গাঁজাসহ হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। তার পিতার নাম শের আলী। প্রায় ৬০ বছর বয়সে একজন বৃদ্ধ মানুষের এমন জঘন্য মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে যে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বয়সে তার নামাজ-কালাম পড়ার কথা, নাতি-নাতনিদের সাথে সময় কাটানোর কথা, কিন্তু তিনি টাকার লোভে জড়িয়ে পড়েছেন এই মরণনেশার ব্যবসায়। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এই বৃদ্ধকে তাৎক্ষণিকভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার গাঁজা বা ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। আন্তর্জাতিক কালো বাজারে খুব কম দামে তৈরি হওয়া একেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট তারা সাধারণ তরুণদের কাছে ২থেকে৩(ডলার) বা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে। এই অবৈধ ব্যবসায় তারা প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত মুনাফা লাভ করে থাকে।
মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ লার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।
শৈলকুপায় একদিনে এই তিনজনের সাজা ও আটকের ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষও যদি ভয় না পেয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে, তবে সমাজ থেকে এই মরণব্যাধি খুব দ্রুতই চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।














