মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন ও নাটকীয় মোড় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অবশেষে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিন তেহরান কোনো ধরনের শুল্ক বা টোল ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেবে। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর থেকে তাদের দীর্ঘদিনের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে, তেলের ওপর থাকা কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং বিদেশে জব্দ করা ইরানের শত শত কোটি ডলার ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার পথও খুলে যাচ্ছে।
এই চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে টিকে থাকে, তবে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ইরান এই যুদ্ধ থেকে একটি কৌশলগত বিজয়ী শক্তি হিসেবেই বিশ্বের সামনে আবির্ভূত হবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০% বা এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথের একক ‘দ্বাররক্ষক’ হিসেবে তেহরানের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশ্বের অন্য দেশগুলোও এখন ইরানের এই অভাবনীয় সাফল্যের দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করবে এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য তারাও হয়তো এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বা কৌশলগত অঞ্চল খোঁজার চেষ্টা করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও খুব দম্ভের সাথে ঘোষণা করেছেন যে হরমুজ প্রণালি ‘চিরদিনের জন্য টোলমুক্ত’ থাকবে, তবে এই জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা বাস্তবে খুবই কম। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত তিন মাসে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই প্রণালি দিয়ে পার হওয়া কিছু জাহাজের কাছ থেকে যাতায়াত বাবদ প্রায় ২০ লাখ ডলার (২,০০০,০০০)পর্যন্তটোলআদায়করেছে।এইফিরপরিমাণযদিভবিষ্যতেএরচেয়েঅনেককমওহয়,ধরাযাকপ্রতিজাহাজেরজন্যকয়েকলাখডলার,তবুইরানপ্রতিবছরবিলিয়নবিলিয়নডলারের(২,০০০,০০০)পর্যন্তটোলআদায়করেছে।এইফিরপরিমাণযদিভবিষ্যতেএরচেয়েঅনেককমওহয়,ধরাযাকপ্রতিজাহাজেরজন্যকয়েকলাখডলার,তবুইরানপ্রতিবছরবিলিয়নবিলিয়নডলারের() একটি স্থায়ী তহবিল পেয়ে যাবে। এই বিপুল আর্থিক মুনাফাই মূলত তেহরানকে তার নতুন অবস্থান যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে সবচেয়ে বেশি প্ররোচিত করবে।
জাহাজের মালিক ও জ্বালানি ব্যবসায়ীরা ইরানকে এই বিশাল অঙ্কের টোল দেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে ক্ষুব্ধ হতে পারেন, তবে এই খরচ আসলে তাঁদের জন্য খুব একটা বড় আর্থিক বোঝা হবে না। হিসাব করলে দেখা যায়, একটি বড় তেল ট্যাংকারের জন্য ২০ লাখ ডলার টোল দেওয়ার অর্থ হলো প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য মাত্র ১ ডলার বাড়তি দেওয়া, যা একটি সাধারণ ক্রেডিট কার্ডের ট্রানজেকশন ফির চেয়েও অনেক কম। অথচ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের লাগাতার হামলার হুমকির কারণে এই পথে বিমা বা ইনস্যুরেন্স খরচ একেবারে আকাশচুম্বী হয়েছিল; কোনো কোনো জাহাজের ক্ষেত্রে প্রতি যাত্রায় বিমা প্রিমিয়াম ৭৫ লাখ ডলারে ($৭,৫০০,০০০) গিয়ে ঠেকেছিল। এখন ইরানকে টোল দেওয়ার মাধ্যমে যদি নিরাপদ যাতায়াতের ১০০% নিশ্চয়তা মেলে, তবে বিমা খরচ অনেকটাই কমে আসবে, যা টোলের বাড়তি খরচকে সহজেই পুষিয়ে দেবে। গ্রিক শিপিং টাইকুন ইভানজ্যালোস মারিনাকিস স্পষ্টই বলেছেন, এত ঝামেলা পোড়ানোর চেয়ে টোল দিয়ে শান্তিতে ব্যবসা করাটাই তাঁর কাছে বেশি শ্রেয়।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও হয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এই একই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাবে। কারণ, তাদের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে সবচেয়ে বেশি লোকসান হবে এই দুটি দেশেরই। তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছে, যাতে তারা পূর্ণ গতিতে লাভজনক তেল রপ্তানি আবার শুরু করতে পারে। উপসাগরীয় এই দেশগুলো ইরানের টোল আদায়ের বিষয়টিকে একটি ‘সাময়িক অনিষ্ট’ হিসেবে মেনে নিতে পারে। কারণ, এটি তাদের হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে নতুন পাইপলাইন তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেবে, যে বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্তত এক দশক লেগে যেতে পারে।
ট্রাম্প অবশ্য জেদ ধরে আছেন যে ইরান বা তার প্রতিবেশী ওমান—কেউই এই জলপথ শাসন করতে পারবে না। কিন্তু গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বারবার প্রমাণ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই শুধু গায়ের জোরে এই প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে পারে না। মে মাসের শুরুতে মার্কিন সামরিক বাহিনী যখন এমন চেষ্টা করেছিল, তখন ইরান অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে তার পাল্টা জবাব দেয় এবং ট্রাম্প সেই অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হন। সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর ভর করেই ইরান এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে; আর দেশটির এই সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারবে না।
এই যুদ্ধের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন। তবে পরিহাসের বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই অভাবনীয় সাফল্য বিশ্বে অন্য এক ধরনের অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে যাচ্ছে। এখন প্রতিটি দেশই এমন কোনো কৌশলগত চোকপয়েন্ট বা প্রবেশদ্বার খুঁজবে, যা দিয়ে রাতারাতি অর্থ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করা যায়। ইয়েমেনের হুথিরা ইতিমধ্যে ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছে এবং চীন তাইওয়ানের বন্দরে আসা জাহাজগুলোকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ববাণিজ্যে যে অবাধ জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ছিল, ইরানের এই পদক্ষেপ সেই দীর্ঘদিনের চেনা কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
















