মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, তা টিকিয়ে রাখতে এবার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। ইসরায়েলের জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল ১২ শনিবার এই ব্রেকিং নিউজ প্রচার করেছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, হামলা বন্ধের কথা বলা হলেও লেবাননের যে অঞ্চলগুলো ইসরায়েল দখল করে রেখেছে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো নির্দেশ এখনো দেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে এখনো কিছুটা শঙ্কা রয়ে গেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ভয়াবহ যুদ্ধের একটি করুণ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তাদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪ হাজার ৫৭ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন আরও ১২ হাজার ১২১ জন। এই হতাহত ব্যক্তিদের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% মানুষই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা। ঘরবাড়ি হারিয়ে লাখ লাখ মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ইসরায়েলের এই হামলা বন্ধের নির্দেশ তাই লেবাননবাসীর জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের চরম অভিযোগ এনে শনিবার আবার হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে ইরান। দেশটির সামরিক কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এটি তাদের ‘প্রথম পদক্ষেপ’ এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর।
এমন চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই একটি আশার খবর দিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শনিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের’ পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে আগামীকাল রোববার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে দুই দেশের ‘টেকনিক্যাল পর্যায়ের’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বিবৃতিতে আরও পরিষ্কার করা হয় যে, মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে পাকিস্তানের এই সফল মধ্যস্থতা বিশ্ব কূটনীতিতে তাদের অবস্থান বেশ মজবুত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া ১৪ দফার ওই সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফাতেই খুব স্পষ্টভাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু গত বুধবার স্মারকটি সই হওয়ার পরও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় ইরান চরম ক্ষুব্ধ হয়। আর এ কারণেই মূলত সুইজারল্যান্ডের পরিকল্পিত আলোচনা কিছুটা বিলম্বিত হয়। এখন ইসরায়েল হামলা বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায় আবার আলোচনার টেবিলে ফেরার পথ সুগম হলো।
বিখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চূড়ান্ত আলোচনায় অংশ নিতে উচ্চপর্যায়ের একটি ইরানি প্রতিনিধিদল শনিবার সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং তেল খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রয়েছেন। এর থেকে বোঝা যায় যে, ইরান তাদের আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ($) ছাড় করানো এবং তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলার বিষয়ে অত্যন্ত জোরালোভাবে কথা বলবে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও শিগগিরই এই বৈঠকে যোগ দিতে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হবেন বলে মার্কিন প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে। পুরো বিশ্ব এখন রোববারের এই বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে। যদি এই বৈঠক সফল হয় এবং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি সই হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই একটি বিশাল স্বস্তির কারণ হবে।
















