মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবং যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে দেশজুড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাও এর বাইরে নয়। এই উপজেলার সাধারণ মানুষকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পুলিশ বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শৈলকুপা থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের একটি যৌথ ও সাহসী অভিযানে এক পুরিয়া গাঁজাসহ মো. রেজাউল করিম রেজা নামের ৫৯ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করা হয়। আটকের পর মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আটককৃত এই বৃদ্ধ মাদক কারবারির পুরো পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তার নাম মো. রেজাউল করিম রেজা। তার পিতার নাম মৃত জবেদ আলী বিশ্বাস এবং মাতার নাম মৃত সারেজান বেগম। তার গ্রামের বাড়ি শৈলকুপা থানার অন্তর্গত রামচন্দ্রপুর এলাকায়। প্রায় ৬০ বছর বয়সে একজন বৃদ্ধ মানুষের এমন জঘন্য মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষকে রীতিমতো অবাক ও হতাশ করেছে। এই বয়সে তার নামাজ-কালাম পড়ার কথা, নাতি-নাতনিদের সাথে সময় কাটানোর কথা, কিন্তু তিনি টাকার লোভে জড়িয়ে পড়েছেন এই মরণনেশার ব্যবসায়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আজকাল অনেক অপরাধী চক্র পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে গ্রামের এমন বয়স্ক মানুষদের মাদকের বাহক বা বিক্রেতা হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ, সাধারণ মানুষ বা পুলিশ তাদের সহজে সন্দেহ করে না।
ঘটনার দিন পুলিশের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। পুলিশ জানতে পারে যে, রামচন্দ্রপুর গ্রামে রেজাউল করিম তার নিজ বাড়িতে বসে অত্যন্ত গোপনে গাঁজা বিক্রি করছেন এবং সেখানে মাদকের আসর বসিয়েছেন। খবর পাওয়ার পরপরই শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অভিযান চালায়। পুলিশ সরাসরি রেজাউল করিমের বসতবাড়িতে হানা দেয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি ঘাবড়ে যান। এরপর পুলিশ তার বসতঘরের বারান্দায় রাখা চৌকির ওপর তল্লাশি চালিয়ে এক পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করে এবং তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
আটকের পরপরই ঘটনাস্থলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। রেজাউল করিম রেজা নিজের অপরাধ স্বীকার করায় এবং হাতেনাতে প্রমাণ মেলায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে গাঁজা রাখা ও সেবনের অপরাধে সরাসরি ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। সাধারণত এই বয়সের মানুষকে পুলিশ সহজে গ্রেপ্তার করতে চায় না, কিন্তু মাদকের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসন জিরো টলারেন্স বা ০% ছাড় দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। তাকে সরাসরি ৬ মাসের সাজা দেওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার গাঁজা বা ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। এই মাদক বিক্রির মাধ্যমে তারা হয়তো দৈনিক ৫বা১০(ডলার) লাভ করে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এলাকার অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ। গ্রামের খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তানেরা অনেক সময় কৌতূহলবশত এসব মাদক সেবন শুরু করে এবং একসময় পুরোপুরি আসক্ত হয়ে পড়ে।
মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।
রামচন্দ্রপুর গ্রামের মতো একটি আবাসিক এলাকায় এমন মাদকের আখড়া গড়ে ওঠায় স্থানীয় অভিভাবকরা এতদিন চরম আতঙ্কে দিন পার করছিলেন। কারণ, গ্রামের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এই মাদক কারবারিদের পাতা ফাঁদে পড়ে বিপথগামী হতে পারে। আজ এই বৃদ্ধ কারবারি প্রশাসন ও পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলে যাওয়ায় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
















