হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে রাজপথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কড়া সমালোচনা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হকার উচ্ছেদ এখন একটি বড় ও স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ইস্যুতেই এবার সরাসরি রাজপথে নেমে এলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন সরকারের হকার উচ্ছেদ অভিযানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি হকারদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। বুধবার, ১৭ জুন ঠিক দুপুর ৩টায় কলকাতার ধর্মতলার লেনিন মূর্তির সামনে থেকে শুরু করে সুবোধ মল্লিক স্কয়ারে অবস্থিত ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের বাড়ি পর্যন্ত এক বিশাল ও প্রতিবাদী মিছিলের নেতৃত্ব দেন তিনি। এই মিছিলে সাধারণ হকারদের পাশাপাশি তৃণমূলের অনেক শীর্ষ নেতাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করতে কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। প্রশাসন বুলডোজার দিয়ে হকারদের দোকানপাট ও ডালা ভেঙে ফেলছে। এই উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধেই মূলত গর্জে উঠেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রতিবাদী মিছিলে মমতার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, দোলা সেন, সুমন চট্টোপাধ্যায়, রামকৃষ্ণ পাল, অপর্ণা মৌলিকসহ আরও একাধিক শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তারা সবাই একসুরে এই উচ্ছেদ অভিযানকে সাধারণ গরিব মানুষের পেটে লাথি মারার সমতুল্য বলে আখ্যা দিয়েছেন।

মিছিল শেষে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত পথসভায় তৃণমূল নেতারা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও ডাবল ইঞ্জিন সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র এক মাস হলো নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। আর এই এক মাসের মধ্যেই তারা গরিব হকারদের ওপর যেভাবে জোরজুলুম, অত্যাচার ও সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রশাসন অমানবিকভাবে বুলডোজার দিয়ে হকারদের তিল তিল করে গড়ে তোলা দোকানপাট ভেঙে ফেলছে এবং শহরজুড়ে এক ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল নেতারা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা কোনোভাবেই এই ধ্বংসলীলা চলতে দেব না। গরিব মানুষের রুটিরুজি নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।

নেতারা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সবার সামনে তুলে ধরেন। তারা বলেন, এই হকাররা তো আর গত এক মাস ধরে রাস্তায় বসে হকারি করছেন না। তারা বছরের পর বছর ধরে রোদ, বৃষ্টি ও ঝড় উপেক্ষা করে এই রাস্তায় হকারি করেই নিজেদের পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অনেক হকারের পুঁজি হয়তো খুবই সামান্য, মাত্র ৫০বা১০০(ডলার) সমমূল্যের দেশীয় টাকা। এই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করেই তারা তাদের সন্তানদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেন। কিন্তু বর্তমান ডাবল ইঞ্জিন সরকার তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তারা এই সন্ত্রাস ও অন্যায় হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে হকারদের পাশে থাকতে তারা ১০০% অঙ্গীকারবদ্ধ।

তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট দাবি রাখা হয়েছে। তারা বলেছেন, যতক্ষণ না সরকার এই গরিব হকারদের জন্য একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা রাস্তা থেকে একজন হকারকেও তুলতে দেবেন না। আগে হকারদের বসার বিকল্প জায়গা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, তারপর উচ্ছেদের কথা ভাবতে হবে। এদিনের এই প্রতিবাদ মিছিলে কলকাতার বিভিন্ন এলাকার প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ সাধারণ হকার অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। তারা তৃণমূল নেত্রীর এমন পদক্ষেপে বেশ সাহস ও ভরসা পেয়েছেন।

মিছিলে অংশ নেওয়া অসহায় হকাররা তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, আমাদের দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) সব সময়ই আমাদের মতো গরিব মানুষের পাশে আছেন। তিনি অতীতেও সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এসেছেন এবং আজও আমাদের অধিকার বাঁচাতে রাস্তায় নেমেছেন। হকাররা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন সরকার আমাদের মতো সাধারণ মানুষের রুটিরোজগারে ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা অবিলম্বে এই সরকারের জনবিরোধী নীতির অবসান চান এবং স্লোগান দেন, “গরিব মারা সরকার, বাংলা থেকে দূর হটো।”

ধর্মতলার লেনিন মূর্তির সামনে থেকে শুরু হওয়া এই মিছিলে আড়াই থেকে তিনশ হকার তৃণমূল নেতাদের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটেন। তারা সরকারের এই অমানবিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দেন এবং প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে সুবোধ মল্লিক স্কয়ারে গিয়ে তাদের মিছিল শেষ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হকার উচ্ছেদের মতো এমন একটি স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজপথে নামায় রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আবার উত্তাপ ছড়াবে। এখন দেখার বিষয়, বর্তমান সরকার এই প্রবল প্রতিবাদের মুখে তাদের উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করে কি না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ