জাতীয় সংসদে যখন দেশের বিশাল অঙ্কের বাজেট আর অর্থনীতির নানা সংকট নিয়ে গভীর আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই একজন সংসদ সদস্যের একটি ব্যতিক্রমী দাবি সবার নজর কেড়েছে। সংসদ সদস্যদের (এমপি) সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে নতুন ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান। শুধু ইলেকট্রনিক সামগ্রীই নয়, ফ্ল্যাটের দরজা ও জানালায় সরকারি খরচে সুন্দর পর্দা লাগিয়ে দেওয়ারও দাবি তুলেছেন তিনি। বুধবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবিগুলো উত্থাপন করেন।
নিজের জন্য বরাদ্দ করা নির্ধারিত সময়ের শেষ পর্যায়ে এসে মিজানুর রহমান হঠাৎ করেই এমপিদের আবাসিক সুবিধার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “আমরা এখানে বসে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেটের ওপর কথা বলছি। এই মহান জাতীয় সংসদে আমরা সম্প্রতি অনেক টাকার সম্পূরক বাজেটও পাস করেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, মাননীয় সংসদ সদস্যদের থাকার জন্য যে আবাসিক ফ্ল্যাটগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর দরজা ও জানালায় এখনো পর্যন্ত কোনো পর্দা ঝোলানো হয়নি। পর্দা না থাকায় এমপিদের পরিবারকে বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা দায়িত্ব নেওয়ার সময় শুনেছিলাম যে আমাদের এসব সরকারি ফ্ল্যাটে একটি করে আধুনিক ওয়াশিং মেশিন এবং মাইক্রোওভেনও দেওয়া হবে। একজন এমপির দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে এগুলো খুবই প্রয়োজনীয় জিনিস। তাই আমি মাননীয় স্পিকার, আপনার মাধ্যমে আমাদের ফ্ল্যাটগুলোতে এই পর্দা, মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিনগুলো দ্রুত পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।” দেশের সাধারণ মানুষ যখন মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন একজন এমপির এমন ব্যক্তিগত সুবিধা চাওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত দাবির পাশাপাশি মিজানুর রহমান দেশের অর্থনীতি ও প্রস্তাবিত বাজেট নিয়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তার বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এবারের বাজেটটি আকারে শুধু বড়ই নয়, বরং এই বাজেটের ঘাটতির অঙ্কটিও নিঃসন্দেহে অনেক বিশাল। এই বিশাল ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার যদি বিদেশি বা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারে, তবে দেশের অর্থনীতির জন্য তা কিছুটা ভালো। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এবং দেশের ক্রেডিট রেটিং কমে যাওয়ার কারণে এই বিদেশি ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
বিদেশি ঋণ না পেলে সরকারকে বাধ্য হয়ে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে হবে। এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত এমনিতেই এখন চরম সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় বড় ঋণখেলাপিরা ব্যাংক থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) সমপরিমাণ টাকা নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না। এমন অবস্থায় সরকার যদি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ পাবেন না। এর ফলে দেশের ব্যাংক খাত পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সাধারণ মানুষের মতে, সংসদ সদস্যদের উচিত নিজেদের সুযোগ-সুবিধার চেয়ে দেশের মানুষের সমস্যাগুলো সংসদে বেশি করে তুলে ধরা। একজন এমপির বেতন ও আনুষঙ্গিক ভাতা মিলিয়ে মাসে প্রায় কয়েক লাখ টাকা আয় হয়। তাই তারা চাইলে নিজেদের টাকায় এসব ছোটখাটো জিনিস অনায়াসেই কিনে নিতে পারেন। সরকারি টাকায় এসব বিলাসসামগ্রী কেনাটা সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকার একধরনের অপচয় বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। এখন দেখার বিষয়, সংসদ ভবন কর্তৃপক্ষ এই এমপির দাবিগুলো মেনে নেয় কি না।














