গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ জোর করে বিভিন্ন মানুষকে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে আমাদের সীমানার ভেতর ঠেলে দেওয়ার (পুশ ইন) চেষ্টা করছে। এই অমানবিক ও বেআইনি কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি। তারা পরিষ্কারভাবে বিএসএফকে জানিয়েছে যে, এভাবে জোর করে মানুষ ঠেলে দেওয়া দুই দেশের মধ্যে থাকা বিদ্যমান নীতি ও সীমান্ত প্রটোকলের সরাসরি পরিপন্থী। সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষ হওয়া চার দিনের সীমান্ত সম্মেলনে বিজিবির পক্ষ থেকে এই কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।
নয়াদিল্লিতে ৮ জুন থেকে শুরু হওয়া বিজিবি ও বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের এই সম্মেলনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনে বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং বিএসএফের পক্ষে ছিলেন তাদের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। শুক্রবার সম্মেলন শেষে বিজিবি তাদের নিজস্ব বিবৃতিতে জানায়, বিএসএফের এমন পুশ ইনের ঘটনায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিজিবি ডিজি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই বাংলাদেশি হয়, তবে ভারত সরকারকে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও প্রটোকল মেনে তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। রাতের অন্ধকারে জোর করে পুশ ইন করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
বিএসএফের পক্ষ থেকে দেওয়া যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে পুশ ইনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হলেও, বিজিবি জানিয়েছে যে বিএসএফ এখন পুশ ইনের বদলে দ্বিপক্ষীয় আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ ফেরত পাঠানোর বিষয়টিতে একমত হয়েছে। তবে শুধু পুশ ইন নয়, সম্মেলনে সীমান্তে সাধারণ মানুষ হত্যার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে তোলা হয়। বিজিবি ডিজি মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় কড়া প্রতিবাদ জানান। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় বা ০% এ নামিয়ে আনার জন্য বিএসএফকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
এছাড়া ভারতের মিজোরাম রাজ্যে থাকা পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিজিবি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফের নতুন করে বেড়া ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়েও বিজিবি কড়া আপত্তি জানিয়েছে, যা ১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকার সরাসরি লঙ্ঘন। অন্যদিকে, ভারতের কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে ছড়ানো মিথ্যা ও বিকৃত খবর নিয়েও বিজিবি ডিজি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিএসএফের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তার জবাবে বিজিবি স্পষ্ট জানায় যে বাংলাদেশ কখনোই রোহিঙ্গাদের ভারতের দিকে যাওয়ার অনুমতি দেয় না।
এদিকে আলোচনার টেবিলে শান্তির কথা বলা হলেও, মাঠের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত শুক্রবার ভোরেও কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ ১২ জনকে পুশ ইন করার চেষ্টা করেছিল। বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চারজন পুরুষ, চারজন নারী এবং চারটি শিশুকে জোর করে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করলে বিজিবি ও স্থানীয় সাহসী মানুষরা তা সফলভাবে প্রতিহত করেন। প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল জানান, ভোরের দিকে এই অপচেষ্টা চালানো হয়, কিন্তু স্থানীয়দের সজাগ দৃষ্টির কারণে তা ব্যর্থ হয়। সাধারণ মানুষ এখন রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন।
শুধু কুষ্টিয়া নয়, ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তেও পুশ ইন ঠেকাতে বিজিবি ও সাধারণ মানুষ যৌথভাবে কাজ করছে। বিজিবির দাবি, গত মাত্র সাত দিনে বিএসএফ অন্তত পাঁচবার এই এলাকা দিয়ে পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিজিবি এখন হ্যান্ডমাইকে সতর্কবার্তা দিচ্ছে এবং ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে অবস্থান নিয়ে নজরদারি চালাচ্ছে। সীমান্তবর্তী গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা হারুন অর রশীদ জানান, বিএসএফ রাতে কাঁটাতারের আলো বন্ধ করে দিয়ে গেট খুলে পুশ ইনের চেষ্টা করে। কিন্তু এলাকাবাসী ও বিজিবির শক্ত অবস্থানের কারণে তারা সুবিধা করতে পারছে না।
বর্তমানে ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন মহেশপুর উপজেলায় ১২টি বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) আছে। এর মধ্যে যাদবপুর, সামন্তা, মাটিলা ও বাঘাডাঙ্গাসহ অন্তত পাঁচটি বিওপি পয়েন্ট পুশ ইনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ মনে করে, ভারতের এমন আচরণ প্রতিবেশীর মতো নয়। বাংলাদেশ সরকারকে এখন আরও কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে ভারত এই পুশ ইন চিরতরে বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
















