মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া পৌরসভা মিলনায়তন আজ কোরআনের আলোয় আলোকিত এক ভিন্ন আমেজের সাক্ষী হলো। তা’লিমুল কোরআনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুয়াল্লিম বা শিক্ষকদের নিয়ে দিনব্যাপী এক বিশেষ মানোন্নয়ন ক্লাস ও জেলা মুয়াল্লিম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তা’লিমুল কোরআন মৌলভীবাজার জেলা শাখা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সুন্দর এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মুয়াল্লিম অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে এই সম্মেলনে অংশ নেন। মূলত কোরআন শিক্ষার মান কীভাবে আরও বাড়ানো যায় এবং সমাজের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে এর আলো কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, সেটাই ছিল এই বিশাল আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন তা’লিমুল কোরআন মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আব্দুর রহমান। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় সম্মেলনটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়। এই মানোন্নয়ন ক্লাসে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক ও মূল্যবান বক্তব্য রাখেন তা’লিমুল কোরআনের কেন্দ্রীয় উস্তায মাওলানা বোরহান উদ্দিন। তিনি তাঁর আলোচনায় একটি সুন্দর, সুস্থ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে আলেম সমাজের ভূমিকার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। তিনি বলেন, শুধু মসজিদের ভেতরে বা মক্তবের চার দেয়ালের মাঝেই আলেমদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করার ক্ষেত্রে আলেমদের প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু নৈতিকতার অভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আমাদের দেশ প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যুবসমাজের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% আজ ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও মাদকের মতো নানা নেতিবাচক দিকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়াবহ ও অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে তাদের রক্ষা করতে হলে ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশের প্রায় ৯০% শিশু তাদের জীবনের প্রথম শিক্ষাটা পায় মক্তবে একজন মুয়াল্লিমের কাছ থেকেই। তাই মুয়াল্লিমরা যদি শিশুদের মনে ১০০% সততা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার বীজ বুনে দিতে পারেন, তবে আগামী দিনে সমাজ থেকে অনেক অপরাধ এমনিতেই কমে যাবে।
দিনব্যাপী আয়োজিত এই চমৎকার মানোন্নয়ন ক্লাসে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তা’লিমুল কোরআন মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার এম শাহেদ আলী। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বর্তমান আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মুয়াল্লিমদেরও নিজেদের শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুদের শুধু কোরআন মুখস্থ করালেই হবে না, বরং এর ভেতরের অর্থ ও শিক্ষা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে প্রয়োগ করতে শেখাতে হবে। একজন মুয়াল্লিমকে হতে হবে সমাজের সবচেয়ে আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। শিক্ষকরা যদি নিজেদের চরিত্র ও কাজের মাধ্যমে আদর্শ স্থাপন করতে পারেন, তবে সমাজ তাদের দেখে অনেক কিছু শিখবে এবং সম্মান করবে।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কুলাউড়া উপজেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক আব্দুল মুন্তাজিম এবং হাফিজ তাজুল ইসলামসহ স্থানীয় আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তারা সবাই মুয়াল্লিমদের এই মহতী কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সমাজের বিত্তবান মানুষদের কোরআন শিক্ষার কাজে সাহায্য করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। তারা বলেন, সমাজের উচিত মক্তব ও মাদ্রাসাগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া, যাতে শিক্ষকরা কোনো ধরনের আর্থিক বা মানসিক কষ্ট ছাড়া নিশ্চিন্তে তাদের শিক্ষাদানের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। শিক্ষকদের অভাব দূর হলে তারা পাঠদানে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারবেন।
এই সম্মেলনে অংশ নেওয়া মুয়াল্লিমরাও ছিলেন বেশ উচ্ছ্বসিত। দীর্ঘদিনের গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে এসে নতুন পদ্ধতির প্রশিক্ষণ পেয়ে তারা নতুন করে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। সম্মেলনে তাদের শেখানো হয় কীভাবে ছোট ছোট শিশুদের আদর ও ভালোবাসার মাধ্যমে কোরআনের প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়। কঠিন শাসন বা শাস্তির বদলে আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা দেওয়ার আধুনিক কৌশলগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। শিক্ষকরা জানান, এই ধরনের মানোন্নয়ন ক্লাস তাদের নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে নিতে এবং নতুন কিছু শিখতে অনেক বেশি সাহায্য করে। তারা জোরালো দাবি জানান, ভবিষ্যতে যেন এমন প্রশিক্ষণের আয়োজন আরও বেশি বেশি করা হয়।
পরিশেষে, দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ এবং শান্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে এই সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। উপস্থিত সকল মুয়াল্লিম একযোগে দৃঢ় শপথ নেন যে, তারা নিজেদের অর্জিত এই জ্ঞান সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবেন। মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজে তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করবেন। কুলাউড়া পৌরসভা মিলনায়তন থেকে এই শিক্ষকরা শুধু নতুন জ্ঞানই নিয়ে যাননি, বরং সমাজ পরিবর্তনের এক বিশাল দায়িত্বভার কাঁধে নিয়ে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে গেছেন।
















