কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সুরেন্দ্রনাথ কলেজে দীর্ঘদিন ধরে চলা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং অভিযুক্ত দেবু ও শিবুকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শনিবার, ৬ জুন দুপুরে এসএফআইয়ের ৫০ থেকে ৬০ জন নেতাকর্মী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে একটি বিশাল প্রতিবাদী মিছিল বের করেন। মিছিলটি সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রধান ফটকের সামনে এসে শেষ হয়। সেখানে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করার পাশাপাশি একটি সাংবাদিক সম্মেলনও করেন। তাদের মূল দাবি, কলেজ ক্যাম্পাসকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
এসএফআই যখন কলেজের সামনে নিজেদের ন্যায্য দাবিদাওয়া নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করছিল, ঠিক সেই সময়েই সেখানে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিরোধী ছাত্র সংগঠন এবিভিপির নেতা-কর্মীরা এসএফআইয়ের ছাত্রদের ঘিরে ফেললে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল হট্টগোল বেধে যায়। পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়। ভারতের রাজনীতিতে ছাত্র সংগঠনগুলোর এমন মুখোমুখি অবস্থান নতুন কিছু নয়। তবে কলেজ প্রশাসন এবং পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে বড় কোনো সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়। কলেজের প্রিন্সিপাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিলে দুই পক্ষকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
বিক্ষোভরত এসএফআই ছাত্রদের দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও সময়োপযোগী। তারা বলেন, সুরেন্দ্রনাথ কলেজে গত ১৫ বছর ধরে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। এই দীর্ঘ ১৫ বছরের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু নেতা কলেজটিকে অপরাধের বড় একটি সিন্ডিকেট বানিয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে কলেজে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ঘোষণা করতে হবে। শুধু এসএফআই নয়, এবিভিপি বা তৃণমূল ছাত্র পরিষদ সবাই যেন এই নির্বাচনে ১০০% স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা কলেজ প্রশাসনকে করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার জন্য এই নির্বাচন খুবই জরুরি।
একই সঙ্গে পূর্ববর্তী ছাত্র সংসদের যাবতীয় আর্থিক লেনদেনের অডিট রিপোর্ট সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ করার জোর দাবি জানান তারা। ছাত্র নেতারা অভিযোগ করেন, ছাত্র সংসদের আসল কাজ নতুন ছাত্রছাত্রীদের কলেজে ভর্তি ও পড়াশোনায় সাহায্য করা। কিন্তু তা না করে বর্তমান নেতারা সাধারণ ও গরিব শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা ফন্দি করে টাকা আত্মসাৎ করতে ব্যস্ত। তাদের দাবি, হিসাবের অডিট রিপোর্ট শুধু কলেজের আলমারিতে বন্দী করে রাখলে চলবে না। বিগত দিনগুলোতে গরিব ছাত্রদের কাছ থেকে আদায় করা লাখ লাখ টাকা, যার বাজারমূল্য হয়তো কয়েক হাজার ডলার ($) ছাড়িয়ে যাবে, তা উইপোকায় খেয়ে নষ্ট করছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অন্তত ৯০% নেতাই সিন্ডিকেটের অংশ বলে তারা দাবি করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে ছাত্র নেতারা স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের বিরুদ্ধেও কঠোর সমালোচনা করেন। তারা তাপস রায় ও সজল ঘোষকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তারা প্রশাসনকে প্রশ্ন করেন, লোক দেখানো কথাবার্তা চললেও দেবু ও শিবুকে এখনো কেন পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না? তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছত্রচ্ছায়াতেই দেবু ও শিবু এত বড় অপরাধী হয়ে উঠেছে। সুরেন্দ্রনাথ কলেজের যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড নাকি এখন দেবুর বাড়ি থেকেই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছে।
ছাত্রনেতারা সাফ জানিয়ে দেন, তারা গত ১৫ বছর ধরে প্রশাসনের কাছে এসব অনিয়মের বিষয়ে নালিশ করে আসছেন। কিন্তু কেউ তাদের কথায় কান দেয়নি। কলেজের ভেতরে পদে পদে দুর্নীতি আর অরাজকতা চলছে। সাধারণ ছাত্ররা কলেজে ভর্তি হতে এলে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। আজ সেই অরাজকতা সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। তারা আর কোনো দুর্নীতি মেনে নেবেন না। দেবু ও শিবুকে গ্রেপ্তার করেই তারা ছাড়বেন। পাশাপাশি তারা নিশ্চিত করতে চান যে, আগামী দিনে কলেজে একটি সুস্থ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে তারা মাথা নত করবেন না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এদিকে কলেজে যখন বাইরে এই চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছে, তখন ভেতরে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা চলাকালীন এমন হট্টগোল ও বিক্ষোভের কারণে কলেজের প্রিন্সিপাল প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য সরাসরি স্থানীয় মুচিপাড়া থানাকে দায়ী করেন। প্রিন্সিপাল গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি আগে থেকেই পুলিশ প্রশাসনকে পরীক্ষার কথা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিলেন। তার পরও কীভাবে পরীক্ষা চলাকালীন এই ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হলো, তার জবাব পুলিশকেই দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা তিনি কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।
















