মায়ের পচা-গলা লাশ উদ্ধার: অপপ্রচারের জবাব দিলেন বুয়েটের অধ্যাপক ছেলে, ওএসডি হলেন যুগ্ম সচিব

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী প্রবীণ নারী নূর জাহান বেগমের পচা-গলা এবং পোকায় ধরা লাশ উদ্ধারের পর দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা এবং নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠিত তিন সন্তান থাকার পরও একজন মায়ের এমন করুণ পরিণতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। এই ঘটনায় অভিযুক্ত বড় ছেলে, যিনি সরকারের একজন যুগ্ম সচিব, তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করা হয়েছে। অন্যদিকে মায়ের প্রতি অবহেলার সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন নিহতের ছোট ছেলে এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান।

গত ৩১ মে রাতে মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ নূর জাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করে। তিনি তার একমাত্র মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার সঙ্গে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। পুলিশ জানায়, অন্তত সাত-আট দিন আগে তার মৃত্যু হয়েছিল এবং লাশটি বিছানায় পড়ে থাকতে থাকতে পচে পোকায় ভরে গিয়েছিল। বাসাটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা এবং ডাস্টবিনের মতো। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবেশীরা বিষয়টি বুঝতে পারেন। নূর জাহান বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্ম সচিব), মেজ ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বুয়েটের অধ্যাপক এবং মেয়ে ফাতিমা নাসরীন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানদের চরম অবহেলাকে দায়ী করে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বুধবার (৩ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য এ কে এম আনিসুর রহমানকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে, অন্যথায় তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) হিসেবে গণ্য করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সাংবাদিকদের জানান, ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী অভিযুক্ত যুগ্ম সচিবের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্যকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ উল্লেখ করে নিজেদের পরিবারের অবস্থান তুলে ধরেছেন বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান। বুধবার বিকেলে একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, মায়ের মৃত্যুতে তারা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত, এর ওপর অনলাইনে অপপ্রচার তাদের ট্রমাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মাকে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, গত ঈদুল ফিতরের দিন বিকেলে রান্না করা খাবার এবং একটি দেয়ালঘড়ি নিয়ে তিনি নিজে মাকে দেখতে গিয়েছিলেন। মায়ের সময়জ্ঞান কমে যাওয়ায় ঘড়িটি দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে মা তার কাছেই ছিলেন এবং করোনার সময় তিনি মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। ২০২৪ সাল থেকে মা তার মেয়ে ফাতিমার সঙ্গে থাকা শুরু করেন।

বাসার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আশিকুর রহমান বলেন, তার মা এবং বোন দুজনেরই মানসিক সমস্যা ছিল। মা সন্দেহপ্রবণ ছিলেন, যা সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গের সঙ্গে মেলে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে বোন ফাতিমাও মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। তবে তাদের কাউকেই কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মানসিক বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়নি। তিনি জানান, তার বোন বাইরে থেকে কোনো গৃহকর্মী রাখতে চাইতেন না এবং মা-ও অন্যের হস্তক্ষেপ পছন্দ করতেন না। তাই তিনি কাজের মানুষ ঠিক করে দিলেও তারা তাকে বাদ দিয়ে দিতেন। ঘটনার দিন বিকেলে বোন ফাতিমা ফোন করে মায়ের সাড়াশব্দ না পাওয়ার কথা জানালে তিনি নিজেই নার্স ও পুলিশ ডাকেন। তবে পুলিশ লাশে পোকা থাকার যে দাবি করেছে, তা তিনি অস্বীকার করেন।

নূর জাহান বেগমের এই করুণ মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি বড় চিত্র তুলে ধরেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, আধুনিক করপোরেট কালচার ও স্বার্থপরতার কারণে আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি এবং বাবা-মায়ের ত্যাগের কথা ভুলে যাচ্ছি। এদিকে এই ঘটনায় নূর জাহান বেগমের চার সন্তানকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। নোটিশে প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার এবং পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে লিখিত জবাব চাওয়া হয়েছে। এই ঘটনা আমাদের সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি কেবল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি?

সম্পর্কিত নিবন্ধ