জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত বাংলাদেশ: বিশ্বমঞ্চে অনন্য এক গৌরব

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বিশ্বমঞ্চে আরও একবার নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করল বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি পদে এক হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনে জয়লাভ করে ইতিহাস গড়েছে আমাদের দেশ। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি ৯৯টি দেশের মূল্যবান ভোট পেয়ে এই সম্মানজনক পদে বিজয়ী হয়েছেন। আগামী পুরো এক বছর তিনি এই বৈশ্বিক মঞ্চে সভাপতির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিজ কাঁধে সামলাবেন। বাংলাদেশের এই জয়ে দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মনে এক অন্যরকম আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি আমাদের জন্য সত্যিই এক বিশাল অর্জন।

নির্বাচনের ভেতরের চিত্রটা বেশ রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনায় ভরপুর ছিল। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গোপন ব্যালটে এই ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ইউরোপের দেশ সাইপ্রাসের জাঁদরেল কূটনীতিবিদ আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস। তিনি পেয়েছেন ৯১ ভোট। মাত্র ৮ ভোটের এই ব্যবধান বুঝিয়ে দেয় কূটনৈতিক লড়াইটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কতটা কঠিন ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর বড় একটি অংশ বাংলাদেশের প্রার্থীর ওপরই আস্থা রেখেছেন। এই বিজয় পরিষ্কার প্রমাণ করে যে, বিশ্ব কূটনীতিতে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও বন্ধুত্বের পরিধি আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়েছে।

এই বিজয়ের সাথে মিশে আছে ৪০ বছর আগের এক সোনালি স্মৃতি। দীর্ঘ চার দশক পর বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসার সুযোগ পেল। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনে এই বিশাল পদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। তিনি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে এই গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তখন তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। আজ ৪০ বছর পর খলিলুর রহমান সেই একই গৌরবের মুকুট আবার দেশের মানুষের জন্য নিয়ে এলেন, যা আমাদের কূটনৈতিক ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়া মোটেও সাধারণ কোনো বিষয় নয়। আগামী এক বছর পুরো বিশ্বের নীতিনির্ধারণী অনেক বিষয়ে খলিলুর রহমানকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বর্তমানে পৃথিবী জুড়ে নানা ধরনের চরম সংকট চলছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, মহামারি আর যুদ্ধবিগ্রহে বিশ্বের প্রায় ৩০% মানুষ সরাসরি নানাভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিতে জাতিসংঘ প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার ()ব্যয়করেথাকে।বিশেষকরেজলবায়ুতহবিলের১০০বিলিয়নডলার()ব্যয়করেথাকে।বিশেষকরেজলবায়ুতহবিলের১০০বিলিয়নডলার(১০০,০০০,০০০,০০০) ছাড়করণের মতো বিষয়গুলো এখন বিশ্বের আলোচনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে। এমন একটি সময়ে এই অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের এক টেবিলে বসিয়ে এই জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানে নতুন পথ দেখাবেন।

কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই জয় বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সুযোগ নিয়ে এসেছে। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ গত কয়েক দশক ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে বিশাল অবদান রেখে চলেছে। বর্তমানে আমাদের দেশের হাজার হাজার সেনাসদস্য বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ দেশে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শান্তি ফেরাতে কাজ করছেন। এছাড়া আমাদের অর্থনীতিও অনেকটা এগিয়েছে, গত এক দশকে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬% থেকে ৭% এর ওপরে ছিল। এখন সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বসে বাংলাদেশ খুব সহজেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার নিয়ে জোরালোভাবে কথা বলতে পারবে। বিশেষ করে আমাদের মতো জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের দাবি এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়টি বিশ্বনেতাদের কাছে আরও বেশি গুরুত্ব পাবে।

এই নির্বাচন জেতার জন্য বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘ সময় ধরে নীরব কূটনীতি চালিয়ে আসছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নিজে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। তিনি তাদের বুঝিয়েছেন যে, বাংলাদেশ কীভাবে বৈশ্বিক সংকট সমাধানে কাজ করতে চায়। তার এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং সরকারের সঠিক পরিকল্পনার কারণেই ৯৯টি দেশ আমাদের পক্ষে ভোট দিতে রাজি হয়। এই সমর্থন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ শুধু নিজের সমস্যা নিয়েই ভাবে না, বরং বৈশ্বিক বিষয়েও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশ্বের বুকে আমাদের লাল-সবুজ পতাকার সম্মান আজ সত্যিই এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।

এই জয় শুধু সরকারের বা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এই জয় পুরো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার ও উজ্জ্বল। দেশের তরুণ প্রজন্ম এই খবর থেকে দারুণ অনুপ্রেরণা পাবে। বিশ্ব রাজনীতিতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও যে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এই বিজয় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আগামী সেপ্টেম্বরে যখন জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে, তখন এই দেশের একজন মানুষ বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন। বিশ্বনেতারা তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। সেই মহামূল্যবান ও গর্বের মুহূর্তটির জন্য এখন পুরো জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ