মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি ধাক্কা আবারও লাগল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পকেটে। জুন মাসের জন্য দেশের বাজারে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল সরকার। আজ রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন এই দামের কথা সবাইকে জানিয়ে দেয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা থেকে ৫ টাকা বেড়ে এখন ১৪০ টাকায় বিক্রি হবে। আর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে সাধারণ মানুষের জন্য সামান্য স্বস্তির খবর হলো, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম আগের মতো ১১৫ টাকাতেই অপরিবর্তিত আছে। আজ রাত ১২টা থেকেই সারা দেশের পাম্পগুলোতে এই নতুন দাম কার্যকর হবে।
বিশ্ববাজারে তেলের এই অস্থিরতার মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে সরাসরি হামলা চালালে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের প্রভাব পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আমাদের দেশেও তেলের সরবরাহ নিয়ে মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। এপ্রিল মাসের দিকে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল কেনার জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় ও লম্বা লাইন দেখা যায়। তবে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে গত ২০ এপ্রিল থেকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে ফিলিং স্টেশনগুলোর ভিড় কমে আসে এবং পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম চড়া থাকায় দেশে তেলের দাম বাড়ানোর চাপ সরকারের ওপর থেকেই যায়।
দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় লাফটি এসেছিল ২০২২ সালের আগস্ট মাসে। সে সময় রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরকার এক রাতেই ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২% বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা করেছিল। মানুষের তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে ওই মাসেই অবশ্য সরকার দাম ৫ টাকা কমাতে বাধ্য হয়। এরপর গত এপ্রিলে সরকার যখন দাম বাড়ায়, তখন জ্বালানি তেলের দাম দেশের ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এবার জুন মাসে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও এক ধাপ বেড়ে যাওয়ায় সেই রেকর্ডও নতুন করে ভাঙল।
সরকার মূলত বিশ্ববাজারের সাথে তাল মেলাতে একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বা ফর্মুলা ব্যবহার করছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে সরকার জ্বালানি তেলের এই স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে। এই নিয়মের অধীনে আগের মাসে বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে সরকারের যে খরচ হয়, তার ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে নতুন দাম সমন্বয় করা হয়। সে হিসেবে মার্চ ও এপ্রিলের শুরুতে সরকার দাম অপরিবর্তিত রাখলেও আন্তর্জাতিক বাজারের চাপে ১৯ এপ্রিল থেকে দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। তখন থেকেই মূলত ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। মে মাসে এই দাম অপরিবর্তিত থাকলেও জুন মাসে এসে তা আবার বাড়ল।
আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের জন্য দুটি আলাদা ব্যবস্থা চালু আছে। উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল এবং বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহারের জ্বালানি যেমন ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম সরাসরি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। প্রতি মাসেই তারা এই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বারবার জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচকে আরও চরমভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের দেশে যেকোনো জিনিসের দাম একবার বাড়লে তা আর সহজে কমতে চায় না। বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল কিনতে সরকারকে প্রচুর পরিমাণে ডলার ($) খরচ করতে হচ্ছে। দেশে এমনিতেই বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারের একটা চাপ রয়েছে। তার ওপর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেশি থাকলে সরকারের আমদানি খরচ অনেক বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
যদিও কৃষি খাত এবং পণ্যবাহী ট্রাক বা বাসের মতো গণপরিবহনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের দাম এবার ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার। এটি সাধারণ যাত্রী ও কৃষকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয়। কারণ ডিজেলের দাম বাড়লে এক লাফে বাসভাড়া থেকে শুরু করে বাজারের সবজি, চাল, ডালসহ সবকিছুর দাম বেড়ে যায়। তবে পেট্রল ও অকটেনের দাম ৫ টাকা করে বেড়ে যাওয়ায় দেশের লাখ লাখ মোটরসাইকেল চালক এবং ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের মাসিক যাতায়াত খরচ এক ধাক্কায় বেশ অনেকটা বেড়ে গেল। বিশেষ করে যারা রাইড শেয়ারিং করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারা এই মূল্যবৃদ্ধিতে বেশ বিপাকে পড়বেন। সাধারণ মানুষ এখন শুধু এটাই চাইছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি যেন দ্রুত শান্ত হয়। বিশ্ববাজারে শান্তি ফিরলে তেলের দাম কমবে এবং দেশের বাজারেও সাধারণ মানুষ এর সরাসরি সুফল পাবে।
















