ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলো শৈলকুপা। এই এলাকার মানুষ সাধারণত কৃষি ও সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই শান্ত জনপদে একটি নীরব ঘাতক অত্যন্ত ভয়ানকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, আর তা হলো মাদক। উঠতি বয়সী তরুণ থেকে শুরু করে অনেক সাধারণ মানুষ এই মাদকের ভয়াল থাবায় নিজেদের জীবন ধ্বংস করছিল। তবে আশার কথা হলো, শৈলকুপার আকাশে জমে থাকা এই কালো মেঘ এখন কাটতে শুরু করেছে। সম্প্রতি শৈলকুপা থানা পুলিশের এক অভাবনীয় ও সাহসী তৎপরতায় মাত্র ৩১ দিনের ব্যবধানে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই অসাধ্য সাধন করে শৈলকুপার সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন এবং প্রশংসায় ভাসছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা।
শৈলকুপায় মাদকের ভয়াবহ থাবা ও অতীত চিত্র
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন শৈলকুপার অলিতে-গলিতে, চায়ের দোকানে বা গ্রামের নির্জন স্থানে মাদকের অবাধ বেচাকেনা চলত। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ নানা ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য খুব সহজেই তরুণদের হাতে পৌঁছে যেত। এই মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকায় চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক কলহের মতো অপরাধ মারাত্মক হারে বেড়ে গিয়েছিল। অনেক বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানকে মাদকের নেশায় ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে নীরবে চোখের জল ফেলতেন। কিন্তু লোকলজ্জা আর মাদক কারবারিদের ভয়ে তারা মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। মাদকের এই অবাধ রাজত্ব পুরো শৈলকুপার সামাজিক পরিবেশকে চরম বিষাক্ত করে তুলেছিল।
ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লার যোগদান ও জিরো টলারেন্স নীতি
শৈলকুপা থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে হুমায়ুন কবির মোল্লা দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। তিনি দায়িত্ব নিয়েই মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মাদক কারবারি সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তার এই দৃঢ় অবস্থান পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও নতুন কাজের স্পৃহা তৈরি করে। তিনি শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সরাসরি মাঠে নেমে নিজের নেতৃত্বে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা শুরু করেন। তার এই সৎ সাহস ও নিরপেক্ষ অবস্থান অপরাধীদের মনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
৩১ দিনের সাঁড়াশি অভিযান ও অভাবনীয় সাফল্য
ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লার সরাসরি নির্দেশনায় শৈলকুপার গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে শুরু হয় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। দিন-রাত এক করে পুলিশ সদস্যরা মাদকের আখড়াগুলোতে হানা দিতে থাকেন। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, মাত্র ৩১ দিনের টানা অভিযানে শৈলকুপা থানা পুলিশ ১০০ জনেরও বেশি মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এর আগে এত অল্প সময়ে এত বিশাল সংখ্যক মাদক ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনার কোনো নজির শৈলকুপায় ছিল না। শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারী নয়, বরং মাদকের বড় বড় ডিলার এবং সাপ্লায়াররাও এই অভিযানে ধরা পড়েছে, যার ফলে মাদকের মূল নেটওয়ার্ক ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার উদ্যোগ
যেকোনো দেশ বা সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ সমাজ। কিন্তু মাদক সেই তরুণ সমাজকেই তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। শৈলকুপায় পুলিশের এই কঠোর অভিযানের ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে এই তরুণ প্রজন্ম। যারা সবেমাত্র মাদকের দিকে ঝুঁকছিল, পুলিশের এমন কঠোর তৎপরতা দেখে তারা এখন ভয়ে পিছিয়ে আসছে। অন্যদিকে, যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিল, মাদকের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবার এখন তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছে। ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লার এই উদ্যোগ মূলত শৈলকুপার আগামী প্রজন্মকে একটি নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার এক মহান প্রচেষ্টা।
সাধারণ মানুষের মনে ফিরে আসা পরম স্বস্তি
পুলিশের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর শৈলকুপার সাধারণ মানুষের মনে এক পরম স্বস্তি ফিরে এসেছে। যে বাবা-মায়েরা একসময় রাতে ঘুমাতে পারতেন না সন্তানের চিন্তায়, তারা এখন শান্তিতে শ্বাস নিচ্ছেন। পাড়া-মহল্লায় এখন আর বখাটেদের সেই পুরনো আড্ডা চোখে পড়ে না। সাধারণ মানুষ চায়ের দোকানে বসে এখন পুলিশের, বিশেষ করে ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লার সাহসিকতার গল্প করেন। একসময় যে মানুষগুলো পুলিশের কাছে যেতে ভয় পেতেন, আজ তারাই পুলিশের কাজে মুগ্ধ হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। একজন সৎ ও সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা যে পুরো সমাজের চিত্র বদলে দিতে পারেন, ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা
মাদকের মতো একটি শিকড় গেড়ে বসা অপরাধ কেবল পুলিশের একার পক্ষে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এই অভিযানে পুলিশের সাফল্যের পেছনে স্থানীয় সাধারণ মানুষেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ওসি সাহেবের আন্তরিক ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষ এখন নির্ভয়ে পুলিশকে গোপন তথ্য দিয়ে সাহায্য করছেন। কোথায় মাদক বিক্রি হচ্ছে, কারা এই ব্যবসার সাথে জড়িত—এসব তথ্য সাধারণ মানুষই পুলিশকে জানাচ্ছেন। জনগণ এবং পুলিশের এই যে বন্ধুসুলভ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা, এটাই মূলত শৈলকুপায় মাদক কারবারিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। এই সম্পর্ক আগামী দিনেও বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার গুরুত্ব
৩১ দিনে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা নিঃসন্দেহে একটি বিশাল মাইলফলক। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ একদিনের নয়। গ্রেফতার হওয়া কারবারিরা যেন জামিনে বের হয়ে আবারও একই পেশায় জড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। পাশাপাশি, যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে শৈলকুপায় ভালো মানের মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা অলস সময়ে বাজে চিন্তায় মগ্ন না হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শৈলকুপায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই অভাবনীয় তৎপরতা এবং ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লার অদম্য সাহসিকতা আমাদের সমাজে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। মাত্র এক মাসের মধ্যে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করে শৈলকুপা থানা পুলিশ প্রমাণ করেছে যে সদিচ্ছা, সততা ও দেশপ্রেম থাকলে সমাজ থেকে যেকোনো অপরাধ দূর করা সম্ভব। ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা আজ শৈলকুপার মানুষের কাছে শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তাই নন, বরং একজন প্রকৃত নির্ভরতার প্রতীক ও ‘হিরো’তে পরিণত হয়েছেন। আমরা আশা করি, মাদকের বিরুদ্ধে এই জেহাদ যেন কোনোভাবেই থেমে না যায়। পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুব দ্রুতই শৈলকুপা একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, শান্ত ও সুন্দর মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে উঠবে, এটাই আমাদের সবার প্রাণের প্রত্যাশা।














