সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশে রাখার সিদ্ধান্তে অনড় ইরান, ট্রাম্পের পাল্টা হুমকিতে চুক্তিতে ঘোর অনিশ্চয়তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের দর-কষাকষি বহু পুরোনো ঘটনা। তবে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনার মাঝে এই ইস্যুতে এবার আরও কঠিন ও অনড় অবস্থান নিয়েছে ইরান সরকার। তেহরান একেবারে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের দেশে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম তারা কোনোভাবেই দেশের বাইরে যেতে দেবে না। এই একটি সিদ্ধান্তই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে এর আগে ইরান যে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, ওয়াশিংটন সম্প্রতি তার একটি আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠিয়েছে। তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেই জবাব বেশ সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ভয়াবহ সামরিক হামলা শুরু করে। টানা কয়েক সপ্তাহ ধ্বংসযজ্ঞ চলার পর অবশেষে গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষ একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এই যুদ্ধে দুই পক্ষেরই শত শত বিলিয়ন ডলার ($) আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরা মাত্র একবার সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন। কিন্তু সেই বৈঠক থেকে আশাব্যঞ্জক কোনো ফলাফল আসেনি। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে কাগজে-কলমে নানা প্রস্তাবের আদান-প্রদান চললেও, চুক্তির বিষয়ে কোনো সুখবর এখনো বিশ্ববাসীর কানে পৌঁছায়নি।

যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধের জায়গাটি হলো ইরানের এই পরমাণু কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই কড়া শর্ত দিয়ে আসছে যে, তেহরানকে তাদের হাতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ সব ইউরেনিয়াম ত্যাগ করে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। কিন্তু ইরান সরকার এই শর্ত মানতে একেবারেই নারাজ। পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার করে আজ বৃহস্পতিবার ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো অবস্থাতেই যেন এক ছটাক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও বিদেশে পাঠানো না হয়।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে এই নির্দেশের কথা নিশ্চিত করেছেন ইরানের ভেতরের দুটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র। ওই সূত্রগুলো জানায়, ইরানের নীতিনির্ধারকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, একবার নিজেদের হাতের সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে দিলে তারা পুরোপুরি ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বেন। তখন ভবিষ্যৎতে যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল খুব সহজেই তেহরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানোর সুযোগ পাবে। এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে রয়টার্স সরাসরি হোয়াইট হাউস এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। তবে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

বর্তমানে ইরানের ভান্ডারে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এর পরিমাণ ৪৪০ কেজিরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ৬০ শতাংশ মাত্রাটি পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ মাত্রার খুবই কাছাকাছি। অবশ্য যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান কিছুটা নরম সুরে জানিয়েছিল, তারা চুক্তির স্বার্থে নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ বিদেশে পাঠিয়ে দিতে রাজি আছে। কিন্তু সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন একের পর এক ধ্বংসাত্মক হামলার হুমকি দিতে থাকেন, তখন নিজেদের সুরক্ষার কথা ভেবে তেহরান সেই সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি সরে আসে।

এমনকি গত বুধবারও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে নতুন করে আবার হামলা চালানোর কঠোর হুমকি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একটি সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে তিনি আপাতত ইরানের জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি আছেন। তবে শর্ত মনমতো না হলে তিনি পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে একটুও দ্বিধা করবেন না। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, ‘আপনারা বিশ্বাস করুন, আমরা যদি তাদের কাছ থেকে সঠিক জবাব না পাই, তাহলে খুব শিগগিরই সেই হামলা শুরু করা হবে। আমরা ইরানের দিকে নিজেদের সামরিক যাত্রা শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে বসে আছি।’

চুক্তির জন্য ইরানের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই এখন দর-কষাকষি চলছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেরি জানিয়েছেন, তারা ওয়াশিংটনের দেওয়া জবাবের প্রতিটি পয়েন্ট খুব নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে দেখছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের এই আগ্রাসী হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে ইরানও। একজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা রুশ গণমাধ্যমের কাছে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের কাছে এমন সব অত্যাধুনিক অস্ত্র মজুত রয়েছে, যেগুলো এর আগে কোনো যুদ্ধে পরীক্ষা করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা এই অজানা অস্ত্রগুলোর ব্যবহার শুরু করবে।

বারুদ হয়ে থাকা এই পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং নতুন করে সংঘাত যেন আর শুরু না হয়, সেই লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই সফরের প্রধান লক্ষ্য হলো দুই পক্ষের মধ্যে জমে থাকা মতবিরোধগুলো কমিয়ে এনে একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী সমঝোতার পথ তৈরি করা। এই চুক্তির ওপর বিশ্ব অর্থনীতির অনেক কিছু নির্ভর করছে। চুক্তি ব্যর্থ হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০ থেকে ৩০ ডলার ($) পর্যন্ত লাফিয়ে বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ ফেলবে। তাই পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এই দর-কষাকষির চূড়ান্ত পরিণতির দিকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ