শৈলকুপায় পথচারীর সঙ্গে ধাক্কা, গুজবে আতঙ্কিত গ্রামবাসীর হাতে প্রাণ গেল মেছোবাঘের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতার চরম অভাব আবারও সবার সামনে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। পথচারীর সঙ্গে আকস্মিক এক দুর্ঘটনার জেরে একটি নিরীহ মেছোবাঘকে পিটিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় গ্রামবাসী। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কাঁচেরকোল ইউনিয়নের উত্তর-মির্জাপুর গ্রামে। বন্যপ্রাণী হত্যার এই নিষ্ঠুর ঘটনায় প্রাণী অধিকারকর্মী এবং সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত দরকারী এই প্রাণীটি স্রেফ মানুষের অজ্ঞতা ও অহেতুক আতঙ্কের শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাল।

স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যায়। ঘটনার দিন পুরাতন বাখরবাহ গ্রামের এক ব্যক্তি নিজের মোটরসাইকেল চালিয়ে রাতের বেলা বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি উত্তর মির্জাপুর গ্রামের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ করেই রাস্তার ওপর একটি বন্যপ্রাণী চলে আসে। চালক কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্রুতগামী মোটরসাইকেলের সঙ্গে প্রাণীটির সজোরে ধাক্কা লাগে। এই আকস্মিক সংঘর্ষে চালক নিজের গাড়ির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন এবং রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে বেশ গুরুতর আহত হন।

দুর্ঘটনার পর মেছোবাঘটিও মারাত্মকভাবে আঘাত পেয়ে ঘাবড়ে যায়। আহত চালকের ভাষ্যমতে, প্রাণীটি ভয় পেয়ে আত্মরক্ষার জন্য তার দিকে তেড়ে আসার চেষ্টা করে। আহত ওই ব্যক্তির ভয়ংকর চিৎকারে আশপাশের গ্রামবাসী দ্রুত লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। রাতের অন্ধকারে একটি বন্যপ্রাণী দেখে তারা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা পরিস্থিতি বোঝার বা স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগকে খবর দেওয়ার কোনো চিন্তাই করেননি। প্রাণীটিকে জাল দিয়ে উদ্ধার করার বদলে সবাই মিলে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেছোবাঘটিকে সেখানেই মেরে ফেলেন। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ভীতির সৃষ্টি হয়।

পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী গবেষকরা বলছেন, মানুষের নির্বিচার বন নিধন এবং জলাভূমি ভরাটের কারণে বন্যপ্রাণীরা আজ চরম খাদ্য ও বাসস্থান সংকটে ভুগছে। গত এক দশকে আমাদের দেশের প্রায় ৪০% প্রাকৃতিক ঝোপঝাড় ও ছোট জঙ্গল উজাড় হয়ে গেছে। বাধ্য হয়েই মেছোবাঘের মতো নিরীহ প্রাণীরা একটু খাবারের খোঁজে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। একটি মেছোবাঘ প্রকৃতিতে প্রচুর ইঁদুর ও কৃষির জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের ফসলের যে উপকার করে, তার আর্থিক মূল্য হিসাব করলে বছরে হাজার হাজার ডলার বা কয়েক লাখ টাকার সমান দাঁড়ায়। অথচ আমরা সামান্য একটু সচেতনতার অভাবে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদকে প্রতিদিন নির্মমভাবে ধ্বংস করছি।

বিশ্বজুড়ে মেছোবাঘ বা ফিশিং ক্যাট এখন একটি বিপন্ন প্রাণী। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন মেছোবাঘকে সংকটাপন্ন প্রাণীর তালিকায় রেখেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে মেছোবাঘের সংখ্যা গত কয়েক বছরে প্রায় ৩০% কমে গেছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) অর্থায়ন করে। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মনমানসিকতা পরিবর্তন না হলে এই বিপুল অর্থের কোনো সুফলই আমরা পাব না। গ্রামের মানুষের ভেতরে এই ধারণা এখনো বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, বাঘ নামের যেকোনো প্রাণী মানেই মানুষখেকো। এই ভুল ধারণার কারণেই মূলত পিটিয়ে মারার ঘটনাগুলো বারবার ঘটে।

এই মর্মান্তিক বন্যপ্রাণী হত্যার বিষয়ে শৈলকুপা বন বিভাগের কর্মকর্তা মোখলেচুর রহমান গণমাধ্যমের কাছে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তিনি এই মেছোবাঘ হত্যার খবরটি জানতে পেরেছেন। গ্রামবাসীর এমন কাজকে তিনি অত্যন্ত অমানবিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মেছোবাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলা সত্যিই খুব কষ্টদায়ক একটি ঘটনা। মানুষ যদি একটু ধৈর্য ধরে প্রাণীটিকে জীবিত অবস্থায় আটক করে বন বিভাগকে খবর দিত, তবে খুব ভালো হতো। কারণ মেছোবাঘ সাধারণত মানুষের জন্য কোনো বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে না এবং এরা স্বভাবগতভাবে মানুষকে আক্রমণও করে না।

মোখলেচুর রহমান আরও পরিষ্কার করে বলেন যে, মেছোবাঘের প্রধান খাবার হলো মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও ছোট ইঁদুর। এরা সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালে ঝোপঝাড়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দিলে এরা অনেক সময় গ্রামের হাঁস-মুরগি ধরতে গৃহস্থের বাড়ির আশপাশে চলে আসে। মানুষ অযথাই ভয় পেয়ে মেছোবাঘকে হিংস্র চিতাবাঘ মনে করে পিটিয়ে মারে। মানুষের এই অহেতুক ভীতি দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে ব্যাপকভাবে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, মেছোবাঘসহ যেকোনো বন্যপ্রাণী হত্যা করা একটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে জেলের পাশাপাশি মোটা অঙ্কের জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইনের সঠিক প্রয়োগ মাঠপর্যায়ে না থাকায় এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। প্রশাসনকে এই ধরনের বন্যপ্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে বুঝতে হবে যে, বন্যপ্রাণীরা আমাদের শত্রু নয়, বরং তারা আমাদের প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন্যপ্রাণী বাঁচলেই আমাদের প্রকৃতি বাঁচবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ