বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গঠিত কারিগরি কমিটি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। পিডিবি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২১% পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পাইকারি দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই খুচরা বা ভোক্তা পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়বে। সাধারণ মানুষ এমনিতেই বাজারের নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে দিশেহারা অবস্থায় আছেন। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তাই ভোক্তাদের প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করছেন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতের কোনো অযৌক্তিক খরচ এবং দুর্নীতির দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে জোর করে চাপানো যাবে না।
বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে পিডিবির এই প্রস্তাব নিয়ে দিনব্যাপী এক গণশুনানি আয়োজন করে বিইআরসি। সরকারি এবং বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছুটা কম দামে তারা সরকার নির্ধারিত পাইকারি মূল্যে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে সেই বিদ্যুৎ বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে সরকার পিডিবিকে নিয়মিত ভর্তুকি দেয়। বিইআরসির কারিগরি কমিটি হিসাব করে দেখেছে, বর্তমান দাম বহাল থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে পিডিবির ঘাটতি দাঁড়াবে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। টাকার অঙ্কে পিডিবির মোট ঘাটতি হতে পারে প্রায় ৬০ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে হলে বিদ্যুতের দাম গড়ে ৭৭.৭৮% বাড়ানো প্রয়োজন। তবে সরকার ঠিক কত টাকা ভর্তুকি দেবে, তার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত দাম নির্ধারণ করবে বিইআরসি। পিডিবি আগামী জুন মাস থেকেই নতুন এই বর্ধিত দাম কার্যকর করতে চায়।
শুনানিতে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) একটি কড়া লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে। ক্যাব বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর জন্য জোরালো আহ্বান জানায়। তারা তাদের বক্তব্যে বলে, বিদ্যুৎ খাতে চরম অদক্ষতা, সিস্টেম লস, নানা প্রকল্পের ধীরগতি এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এখন চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, সেই বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো ঠিক নয়। পিডিবি একের পর এক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প হাতে নিয়ে নিজেদের খরচ বাড়িয়েছে। এই ভুল নীতি ও অব্যবস্থাপনার দায় সাধারণ ভোক্তারা কেন নেবে, সেই প্রশ্ন তোলেন উপস্থিত বক্তারা।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারের ওপর। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন শুনানিতে বলেন, কোনো অজুহাতেই এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো উচিত নয়। বিদ্যুতের দাম বাড়লে সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বাড়বে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক জামাল উদ্দিন মিয়া জানান, বিদ্যুতের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা হারাবে দেশের পোশাক খাত। এমনিতেই দেশের রপ্তানি দিন দিন কমছে, তাই বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
গত দেড় দশক ধরে এই ধরনের গণশুনানিতে নিয়মিত অংশ নিয়ে ভোক্তাদের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরতেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। কিন্তু বর্তমান কমিশনের প্রতি চরম অনাস্থা জানিয়ে তিনি এবারের শুনানি পুরোপুরি বর্জন করেছেন। ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, প্রান্তিক ও গরিব মানুষের কথা চিন্তা করে কোনোভাবেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো উচিত নয়। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার মূলত জনগণের করের টাকা থেকেই এই ভর্তুকি দেয়। সরকারের মুনাফা করার চিন্তা থেকে সরে এসে বিইআরসির উচিত দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করা। সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া উল্টো বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য নতুন করে শুনানি আয়োজনের দাবি জানান।
বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিতরণ সংস্থার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) পিএলসি। তারা নিজেদের লোকসান ঠেকাতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের চার্জ ১৮ পয়সা বাড়ানোর দাবি করেছে। কারিগরি কমিটি এটি প্রায় ১৪ পয়সা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। পিজিবি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশীদ জানান, বিতরণ সংস্থাগুলোর চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই তারা নতুন সঞ্চালন লাইন তৈরি করেন। পায়রা থেকে নতুন একটি লাইন করার জন্য তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ($১ বিলিয়ন) খরচ হবে। মাতারবাড়ি থেকেও নতুন প্রকল্প করার চাপ আছে। কিন্তু অনেক সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সঞ্চালন লাইনগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকে, ফলে পিজিবির আয় কমে যায়। এর জবাবে ভোক্তারা প্রশ্ন তোলেন, কার অনুমতিতে পিজিবি হাজার হাজার কোটি টাকার এমন প্রকল্প নিয়েছে এবং বিইআরসিকে কেন আগে জানানো হয়নি।
কারিগরি কমিটি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) লাভজনক ২১টি সমিতির জন্য আলাদা পাইকারি দাম নির্ধারণের একটি প্রস্তাব সরাসরি বাতিল করে দিয়েছে। প্রথম দিনের দীর্ঘ শুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, পাওয়ার গ্রিডের চলমান সব প্রকল্পের ব্যয় তারা হিসাবে ধরেননি। যতটুকু কাজ হয়েছে, শুধু ততটুকু খরচই হিসাবে নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের খুচরা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সবার মতামত ও বক্তব্য গভীরভাবে বিবেচনা করে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করেন।
















