বিশ্বের কিছু ক্ষমতাধর দেশ এখনো পুরোনো ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা আঁকড়ে ধরে আছে। তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে নিজেদের জোর খাটিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের এই অশুভ চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তি নষ্ট হচ্ছে এবং পুরো বিশ্ব আবার সেই পুরোনো ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার এক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বুধবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে এক ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণায় ঠিক এভাবেই নিজেদের গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
এই কড়া কথার নিশানা ঠিক কার দিকে, তা সরাসরি কারও নাম না নিলেও বুঝতে কারও বাকি নেই। এই ঘোষণার পরপরই তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ সামরিক পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেন। মঙ্গলবার রাতে পুতিন বেইজিংয়ে পৌঁছান। এরপর বেইজিংয়ের বিখ্যাত গ্রেট হলে দুই নেতার মধ্যে গভীর ও দীর্ঘ আলোচনা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুতিনের এই সফরের মাত্র ছয় দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার চীন সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন। ট্রাম্পও ওই একই গ্রেট হলে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দুই ঘণ্টার বেশি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছিলেন।
সি ও পুতিনের যৌথ বিবৃতিতে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ নামের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা সারা বিশ্বের কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে তারা জানান, পারমাণবিক চুক্তির বিকল্প নিয়ে কাজ না করে আমেরিকা বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মূলত এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা সীমিত রাখার ঐতিহাসিক চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’–এর কথা বোঝানো হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসেই এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। রাশিয়া চুক্তিটি আরও এক বছর বাড়ানোর শক্ত প্রস্তাব দিলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে সরাসরি অসম্মতি জানান।
পুতিনের এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, এটি পুতিনের ২৫তম চীন সফর। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের হিসাব বলছে, পুতিন এবং সি চিন পিং এ পর্যন্ত ৪০ বারের বেশি একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন। মঙ্গলবার তারা প্রথমে নিজেদের মধ্যে একান্ত বৈঠক করেন এবং পরে দুই দেশের বড় প্রতিনিধিদলকে সঙ্গে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমাদের চাপ মোকাবিলায় তাদের এই একতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে সি চিন পিং এই আলোচনাকে অত্যন্ত গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে পুতিন বলেন, রাশিয়া ও চীনের বর্তমান সম্পর্ক আধুনিক বিশ্বে আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের একটি নিখুঁত মডেল। সমান অধিকার, পারস্পরিক সমর্থন এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করেই তাদের এই শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে। চলতি বছর চীন-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার ৩০তম বার্ষিকী উদ্যাপন করছে। একই সঙ্গে দুই দেশের সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তিরও ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে।
রাজনীতি ও সামরিক কূটনীতির বাইরে এই সফরের অন্যতম বড় লক্ষ্য ছিল অর্থনীতি ও জ্বালানি বাণিজ্য। পুতিনের সফরের আগে থেকেই মস্কো বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, তারা চীনের সঙ্গে আরও কয়েকটি মেগা জ্বালানি চুক্তি করতে চায়। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুতিন যখন চীন সফরে গিয়েছিলেন, তখন রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানি গাজপ্রম একটি বড় ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, মঙ্গোলিয়ার ভেতর দিয়ে রাশিয়া থেকে চীনে গ্যাস সরবরাহের জন্য ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ নামের পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে দুই দেশ একযোগে কাজ করবে। এই বিশাল পাইপলাইনটি ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এবং এর মাধ্যমে প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ($) মূল্যের বাণিজ্য হবে, যা রাশিয়ার অর্থনীতিকে বড় ধরনের স্বস্তি দেবে।
চীন সাধারণত এই মেগা পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে জনসমক্ষে খুব একটা কথা বলতে চায় না। তবে এবারের বৈঠকে সি চিন পিং পাইপলাইনের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করলেও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, জ্বালানি ও সম্পদের সংযোগের ক্ষেত্রে এই আর্থিক সহযোগিতাই হওয়া উচিত চীন ও রাশিয়া সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। ক্রেমলিন থেকেও জানানো হয়েছে, এই বৃহৎ প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে দুই দেশ একটি সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছেছে। যদিও তারা এখনই বিস্তারিত কোনো তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করেনি। বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব অন্তত ৫০% বাড়াতে সি ও পুতিনের এই একতা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এখন একটি বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
















