নারী সাফের প্রস্তুতিতে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের দুর্দান্ত শুরু, কাসেম বুন্ডিতকে হারাল ২-০ গোলে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আসন্ন সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের আগে নিজেদের প্রস্তুতিটা দারুণ এক জয় দিয়েই শুরু করল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি ম্যাচে তারা স্বাগতিক দেশের ক্লাব কাসেম বুন্ডিতকে ২-০ গোলের পরিষ্কার ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছে। দর্শকশূন্য মাঠে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বাংলাদেশের মেয়েরা শুরু থেকেই দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামে। আগামী সাফে টানা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জয়ের যে বড় স্বপ্ন দল দেখছে, এই জয় সেই লক্ষ্যের পথে মেয়েদের সাহস অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষ মেয়েদের এই সাফল্যের খবর শুনে দারুণ আনন্দিত।

ম্যাচের শুরু থেকেই কাসেম বুন্ডিতের খেলোয়াড়দের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করে বাংলাদেশের মেয়েরা। বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে তারা মাঠের দুই প্রান্ত দিয়ে একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে। এই আগ্রাসী ফুটবলের ফলও আসে খুব দ্রুত। প্রথমার্ধের মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী চমৎকার এক শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। আনিকার এই গোলটি দলের অন্য খেলোয়াড়দের আরও বেশি উজ্জীবিত করে। গোল হজম করে থাই ক্লাবটি ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের জমাট রক্ষণের সামনে তারা একদমই সুবিধা করতে পারেনি। ফলে এক গোলের স্বস্তি নিয়েই বিরতিতে যায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

দ্বিতীয়ার্ধেও মাঠের চিত্র খুব একটা বদলায়নি। মেয়েরা নিজেদের ১০০% মনোযোগ ধরে রেখে প্রতিপক্ষের রক্ষণে বারবার হানা দিতে থাকে। থাইল্যান্ডের প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ার মাঝেও মেয়েদের ফিটনেস ও স্ট্যামিনা ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঝমাঠের দখল নিয়ে তারা চমৎকার পাসিং ফুটবল উপহার দেয়। ম্যাচের ৭৭ মিনিটে উমহেলা মারমা দলের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন। তার এই গোলের পরই মূলত কাসেম বুন্ডিতের ম্যাচে ফেরার সব আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত রেফারি বাঁশি বাজালে ২-০ গোলের সহজ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ দল। কোচ এই ম্যাচে দলের আক্রমণভাগ ও মিডফিল্ডের বোঝাপড়া দারুণভাবে পরখ করে নেন।

আগামী ২৫ মে ভারতের পর্যটন নগরী গোয়ায় পর্দা উঠতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের। এই টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। মুকুট ধরে রাখার বড় মিশন সামনে রেখেই দল গত ৭ মে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাড়ি জমায়। সেখানে তারা ১৫ দিনের একটি নিবিড় কন্ডিশনিং ক্যাম্প করছে। দেশের ফুটবল ফেডারেশন মেয়েদের এই আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতির জন্য প্রায় ২৫,০০০$ ডলার বা কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। উন্নত পরিবেশে অনুশীলনের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক শক্তি বাড়ানোর জন্যই মূলত এই বড় অঙ্কের খরচ করছে কর্তৃপক্ষ। কারণ বড় টুর্নামেন্টের আগে এমন একটি ক্যাম্প খেলোয়াড়দের একতাবদ্ধ করতে দারুণ কাজ করে।

ব্যাংককের এই কন্ডিশনিং ক্যাম্পে শুধু কঠোর অনুশীলন করেই সময় পার করছে না মেয়েরা। নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা নিখুঁতভাবে যাচাই করতে তারা মোট দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা সাজিয়েছে। প্রথমটিতে দারুণ জয় পাওয়ার পর এখন সবার চোখ দ্বিতীয় ম্যাচের দিকে। আগামী ১৭ মে থাইল্যান্ডের দ্বিতীয় বিভাগের দল ব্যাংকক স্পোর্টস স্কুল ক্লাবের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। ওই ম্যাচটি দলের বেঞ্চের শক্তি এবং তরুণ খেলোয়াড়দের সামর্থ্য পরখ করে দেখার দারুণ একটি সুযোগ এনে দেবে। এরপর ব্যাংককের ক্যাম্পের পাট চুকিয়ে আগামী ২১ মে সরাসরি ভারতের গোয়ার উদ্দেশে উড়াল দেবেন দলের সব সদস্য।

এবারের সাফে ‘বি’ গ্রুপে লড়বে বাংলাদেশ। এই গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে স্বাগতিক ভারত এবং দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বাংলাদেশের মিশন শুরু হবে আগামী ২৯ মে। প্রথম ম্যাচেই তারা মালদ্বীপের মুখোমুখি হবে। টুর্নামেন্টের শুরুটা বড় জয় দিয়ে করতে পারলে দলের আত্মবিশ্বাস আরও অনেক মজবুত হবে। মালদ্বীপকে হারাতে পারলে সেমিফাইনালের পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এরপর ৩১ মে গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে উত্তেজনাকর ও হাইভোল্টেজ ম্যাচে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশের মেয়েরা। গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচটিই নির্ধারণ করে দেবে টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং সেমিফাইনালে তারা কাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবে।

ভারতের মাটিতে তাদের বিপক্ষে খেলাটা সবসময়ই বেশ চাপের বিষয়। গ্যালারিতে হাজার হাজার স্বাগতিক সমর্থক তাদের দলকে অন্তত ৫০% বাড়তি সুবিধা এনে দেবে। তবে বাংলাদেশের মেয়েরা অতীতে বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি সামলে নিতে পারে। আগের আসরগুলোতে তারা ভয়ডরহীন ফুটবল খেলে কোটি বাঙালির হৃদয় জয় করেছে। এবার দলে বেশ কয়েকজন তরুণ ও প্রতিভাবান খেলোয়াড় যুক্ত হওয়ায় দলের গতি আরও বেড়েছে। দেশের মানুষ এখন অধীর আগ্রহে টুর্নামেন্ট শুরুর অপেক্ষা করছে। সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, মেয়েরা যদি নিজেদের স্বাভাবিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পারে, তবে গোয়ার মাটি থেকে টানা তৃতীয়বারের মতো সাফের সোনালি ট্রফিটা তারা ঠিকই ছিনিয়ে আনবে।

মেয়েদের এই অদম্য স্পৃহা দেশের নারী ফুটবলের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। ফুটবল ফেডারেশন ও স্পনসররা যদি এভাবেই তাদের পাশে থাকে, তবে আগামী দিনে বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের মেয়েরা দাপটের সাথে খেলবে। থাইল্যান্ডের মাটিতে প্রস্তুতি ম্যাচের এই জয় সেই সোনালি ভবিষ্যতেরই একটি দারুণ পূর্বাভাস। এখন শুধু সাফের মূল মঞ্চে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পালা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ